ড. মো. শামছুল আলম
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ও শহীদ জিয়া

বাংলাদেশ ও শহীদ জিয়া

সমাজ-সংসারে জাতির ক্রান্তিলগ্নে যেসব ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটে, দেশ ও জাতিকে বিশৃঙ্খলা অন্যায় অত্যাচারের হাত থেকে উদ্ধার করেন যে, এবং যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বীরোচিত কর্মের কারণে গোটা জাতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের জনগণ যখন শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালী স্বৈরশাসনে নিষ্পেষিত, অত্যাচারে জর্জরিত, দেশ যখন দুর্ভিক্ষ কবলিত, আওয়ামী শাসকগোষ্ঠী জনগণকে শোষণ ও বঞ্চিত করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছিল, সেই সময়ে বীরোত্তম রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করে দেশ-কাল-জাতির কাছে চিরকালীন ভক্তি-শ্রদ্ধা-ভালোবাসার আসন অলংকৃত করে রয়েছেন। তার দীপ্ত প্রত্যয় ও জীবনাদর্শ দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেছে।

প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সের সক্রেটিস, পেরিক্লিসরা যেভাবে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায়, ঠিক সেভাবে বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান মানুষকে জাগিয়ে সুসংঘবদ্ধ গণঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। জিয়াউর রহমানই প্রথম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হতভম্ব জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ স্বাধীন করতে পথের দিশা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে ভারতে সফরে গিয়েছিলেন। তার সম্মানে প্রদত্ত এক ভোজসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি খুব স্পষ্টভাবে বলেন যে, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসে আপনার আসন সবচেয়ে স্থায়ী হয়ে গেছে সেদিন, যেদিন আপনি সবার আগে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’ জিয়াউর রহমান প্রথম চট্টগ্রামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে থাকেননি, তিনি নিজে রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু করেছেন, মুক্তি ও গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। তিনি জেডফোর্স গঠন করেছেন। অসম সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। অথচ এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক ঊর্ধ্বতন নেতা কলকাতায় বসে অলস সময় কাটিয়েছেন। তাদেরই অনেকেই আজ বলছেন জিয়া মুক্তিযুদ্ধ করেননি। জিয়াউর রহমানের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে তিনি এগিয়ে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের তিনি আলাদা করেছেন। এজন্য তিনি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করে দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকে একত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করেছেন। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে, ‘আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের’ও প্রতিস্থাপন করে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে মর্যাদা প্রদান করেছেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। যাতে দেশ অন্য রাষ্ট্রের প্রতি নির্ভরশীল না হয়। এজন্যই জিয়াউর রহমান দেশকে যাবতীয় আধিপত্য ও বহির্দেশীয় হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা ও দেশের সমৃদ্ধি গৌরব মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি প্রদান করেছিলেন।

প্রকৃত অর্থে তার রাজনীতি ছিল কৃষিবিপ্লবের রাজনীতি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও শিল্পবিপ্লবের রাজনীতি, পরিবার-পরিকল্পনার রাজনীতি, নারী ও যুব জাগরণের রাজনীতি, বাংলাদেশ সরকারের মহিলা মন্ত্রণালয়, যুব মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয় জিয়ার রাজনীতির ফসল। এর বাইরেও, নারীর কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বেকারত্ব দূরীকরণ, আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকরণ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, এমনকি বিকেএসপি জিয়ার রাজনীতির অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে, দেশ ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবন জিয়ার রাজনীতির অসাধারণ ফসল।

জিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, তার রাজনীতি ছিল ‘মা, মাটি মানুষের রাজনীতি’। মাটি ও মানুষের একেবারে কাছে তিনি চলে গিয়েছিলেন। প্রচলিত শহুরে ঘেঁষা রাজনীতিকে তিনি কঠিন করে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় গ্রামগঞ্জে তিনি নিয়মিত ছুটে গেছেন। নিরাপত্তা বেষ্টনীর তোয়াক্কা না করে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন, নিজ হাতে গাছ লাগিয়েছেন, গেঞ্জি আর প্যান্ট পরে কোদাল চালিয়ে খাল কেটেছেন, কারখানায় মেশিন চালিয়েছেন। নিজে মাঠে নেমে কাজ করে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর আগে ও পরে কোনো রাজনীতিবিদকে প্রকৃত অর্থে জনগণ এ ধরনের কাজ করতে আর দেখেনি। সেজন্য জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের জিয়ায় পরিণত হয়েছিলেন।

জিয়ার রাজনীতি ছিল গণমানুষের সংগঠনের রাজনীতি। তিনি একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি চালু করেছিলেন। গ্রাম উন্নয়নের জন্য গ্রাম সরকার, গ্রামের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য নগ্নপদ ডাক্তারের পরিকল্পনা জিয়ার রাজনীতিরই ফসল। জিয়াউর রহমান প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি করে সাংগঠনিক আলোচনা করতেন। ছোট-বড় সবার সঙ্গে মিশতেন, কথা বলতেন। নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং তাদের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেও বলতেন। জিয়া তার সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো সাংগঠনিক সভা করেছেন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জনকল্যাণমূলক বিবিধ কার্যক্রমের ফলে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসে। দেশ ও বিদেশে তার শাসনামল যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে দেশি-বিদেশি আধিপত্যবাদী ও কুচক্রী মহল দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস করার চক্রান্ত শুরু করে। যার ফলে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করেন। মূলত এ হত্যাকাণ্ডের দ্বারা জিয়াউর রহমান শাসনামলে সূচিত দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তি ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কিন্তু আধিপত্য ও সম্প্রসারণবাদী, শক্তির চেষ্টা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সূচিত উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে দেশের মানুষ মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিল বলেই জিয়াউর রহমানের শাহাদাত-পরবর্তী সময়ে বিএনপি আরও শক্তিশালী হয়ে তার যোগ্য সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তিনবার সরকার গঠন করে। মূলত রাষ্ট্রপতি জিয়ার অনুসৃত নীতি ও কর্মসূচিকে ধারণ করেই বর্তমানে ১/১১-পরবর্তী সংকট মোকাবিলা করেন আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া। বর্তমানে তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে আগামী দিনে দেশের শাসন কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করতে সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।

লেখক: সরকার ও রাজনীতি বিভাগ

ও ডিন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এবারও ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে : তারেক রহমান

জবি সিন্ডিকেটের সদস্য হলেন অধ্যাপক ড. মঞ্জুর মুর্শেদ

বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজা আজ

রাজউক অধ্যাদেশ জারি, বোর্ড সদস্য হবেন ৭ জন

নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যালট বাক্স ছিনতাই সম্ভব নয় : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

সিজিএসের সংলাপ / ‘মিন্টো রোডে সচিবদের ফ্ল্যাট বিলাসবহুল হোটেলকেও ছাড়িয়ে গেছে’

ঢাবিতে ধানের শীষের পক্ষে ছাত্রদল নেতার শুভেচ্ছা মিছিল 

জবি শিক্ষার্থীদের বিশেষ বৃত্তির তালিকা প্রকাশ

এক্সপ্রেসওয়েতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে টোল দিতে হবে না ঢাবি শিক্ষার্থীদের

ভাসানীর কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় গণভোটকে ‘হ্যাঁ’ বলুন

১০

জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী সমাবেশে অস্ত্রসহ আটক ২

১১

ম্যানইউকে বিদায় বলছেন ক্যাসেমিরো

১২

একটি দল প্রবাসীদের ব্যালট পেপার দখল করে নিয়েছে : তারেক রহমান

১৩

বিপিএল ফাইনালকে ঘিরে বিসিবির বর্ণিল আয়োজন

১৪

রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনে ধানের শীষই ভরসা : রবিউল

১৫

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল এমপি প্রার্থীর

১৬

ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী জনসভায় জনতার ঢল

১৭

প্রবাসীদের নিয়ে জামায়াত আমিরের স্ট্যাটাস

১৮

নির্বাচনে এমএফএসের অপব্যবহার রোধে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন-বিকাশের সমন্বয় কর্মশালা

১৯

আন্দোলনে এনসিপি নেতাদের কী অবদান, প্রমাণ চেয়ে জিএম কাদেরের চ্যালেঞ্জ 

২০
X