ছবির মতো গ্রাম কুসুমপুর। বাগানভরা গাছ। গাছভরা ফল। মাঠভরা গরু।
একদিন গরুগুলো কী যেন দেখে ভয় পেয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। একটা গোল চাকতি। দেখতে পাতিলের মতো। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো অদ্ভুত এক প্রাণী। চিকন তার মাথা। একটা মাত্র চোখ। মাথার ওপর লম্বা দুটো শুঁড়। হাত-পা লিকলিকে।
গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রাণীটা গেল খোকনদের বাড়ি। দরজা খুলে খোকন অবাক।
‘কে তুমি! কোত্থেকে এসেছ?
প্রাণীটা বলল, ‘আমি চিড়িং। উড়ুং গ্রহ থেকে এসেছি।’
চিড়িংকে দেখতে গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাই হাজির। কেউ ভয় পেল, কেউ উঁকি দিয়ে দেখল। কেউ সাহস দেখাতে খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
খোকন বলল, ‘ভেতরে আসো। অনেক দূর থেকে এসেছ, খিদে লেগেছে নিশ্চয়ই। কী খাবে? মাকে বলি তোমাকে গুড় আর মুড়ি দিতে।’
চিড়িং বলল, ‘তোমার কাছে রিরিং ফল আছে? আমি শুধু রিরিং ফল খাই।’
খোকন অবাক। খোকনের মা-বাবাও অবাক। এটা আবার কোন ফল? ইন্টারনেটে খুঁজেও এ নামে কোনো ফল পেল না খোকন। গ্রামে হৈচৈ পড়ে গেল। সবাই চিড়িংয়ের জন্য রিরিং ফল খুঁজতে চলল।
এ বন-ও বন খুঁজে হয়রান খোকন। আম আছে, জাম আছে, নারিকেল আছে। রিরিং কোথায় পাই? এমন সময় খোকনের মাথায় এলো বুদ্ধি। গেল চিড়িংয়ের কাছে।
‘ফলটা কেমন দেখতে? একটা বর্ণনা দাও। তাহলে খুঁজতে সুবিধা হবে।’
চিড়িং বলল, ‘তোমাদের এই পৃথিবীর মতো চ্যাপ্টা, একটু এবড়োখেবড়ো।’
‘কমলালেবু? পৃথিবী তো কমলালেবুর মতো।’
‘নাহ। মহাকাশ থেকে দেখলে বুঝতে। পৃথিবী গোলগাল হলেও সবখানে সমান না। কিছু জায়গা একদম থ্যাবড়ানো।’
কিন্তু এমন থ্যাবড়ানো ফল আবার কোনটা? আম, নারিকেল, পেয়ারা, লটকন থেকে শুরু করে দূরের গ্রাম থেকে আনা স্ট্রবেরি আর ড্রাগন ফলও দেখানো হলো চিড়িংকে। একটাও না। বাজার থেকে আপেল, কমলা, নাশপাতি কিনে আনা হলো। কিন্তু খোকন বুঝতে পেরেছে এতেও কাজ হবে না। কারণ এ ফলগুলো বেশ মসৃণ। এবড়োখেবড়ো নয় মোটেও।
এদিকে ফলটা না পেয়ে চিড়িং হয়ে গেল দুর্বল। মহাকাশযানে চড়ে যে আবার বাড়ি ফিরে যাবে সে শক্তিও নেই গায়ে।
এমন সময় খোকনদের বাড়ি বেড়াতে এলো খোকনের দাদি। দাদি এসেই উঠানে তার থলেটা রাখলেন। খোকন জানে, থলেতে আছে দাদির গাছের সবজি, পুকুরের মাছ, মুরগির ডিম আর গাছের ফল। ফল! ফলের কথা মনে হতেই ভিনগ্রহের চিড়িংকে নিয়ে গেল দাদির কাছে। দাদি সব শুনলেন। তারপর চিড়িংকে বললেন, ফলফলাদি খাইতে চাইলে আমার লগে নিশিন্দাপুরে চলো বাপু। সেইখানে পানিফল, কাউফল, বৈঁচি, বেতফল, বিলিম্বি, জামরুল সব পাইবা। খোকন মনে মনে মিলিয়ে দেখল, চিড়িং যেমনটা খুঁজছে তেমন ফল এগুলো নয়। কিছুটা মিল আছে কাঁঠালের সঙ্গে। তবে কাঁঠালের মতো অত শক্ত নয় ওটা। অত বড়ও নয়।
গ্রামের মানুষজন একসময় যার যার কাজে চলে গেল। উঠানে দাদির থলে থেকে এটা-ওটা বের করতে শুরু করেছে খোকন। হঠাৎ ব্যাগ থেকে বের করা হলুদ রঙের বস্তুটা দেখেই লাফিয়ে উঠল চিড়িং।
‘আরে এটাই তো আমার রিরিং ফল! জলদি দাও!’
খোকন বোকার মতো হাসল। সে নিজেও বুঝতে পারছে না জিনিসটা কী। দাদি রাগী রাগী চোখে খোকনের দিকে তাকালেন। তারপর ফলটা নিয়ে চামড়া ছিলে খাইয়ে দিতে থাকলেন ভিনগ্রহের চিড়িংকে।
‘খা বাবা, খা। এইটা আমার নিজের হাতে লাগানো গাছের ফল।’
‘ও! দাদি তুমি এই ফলটার কথাই বলতে! আরে তাই তো! ফলটা দেখতে একদম বেঢপ। মনে হবে একটা হলুদ রঙের ময়দার দলা কেউ দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। কিন্তু এর নামটা...।’
দাদি খোকনের কান মলে দিয়ে বললেন, ভিনগ্রহের প্রাণীর কাছে গ্রামের মানসম্মান ডুবিয়ে দিলিরে বোকা। নিজের দাদির বাড়ির ফলগাছ, সেটাই চিনতে পারলি না! এইটাকে বলে ডেউয়া। বুঝলি!
ওদিকে ভিনগ্রহের চিড়িং ডেউয়া খেতে ব্যস্ত। খোকনও একটা হাতে নিয়ে খেতে লাগল। টক-মিষ্টি ফলটার নাম সে আর জীবনেও ভুলবে না।
মন্তব্য করুন