শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৩, ১২:২৭ এএম
অনলাইন সংস্করণ

ছিনতাই মামলায় নির্যাতন করে ৭২ লাখ টাকার চেক নেওয়ায় ২ পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত

ওসি শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও পরিদর্শক সুরুজ উদ্দিন আহম্মেদ। ছবি: সংগৃহীত
ওসি শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও পরিদর্শক সুরুজ উদ্দিন আহম্মেদ। ছবি: সংগৃহীত

ছিনতাই মামলার ঘটনায় নির্যাতন করে ৭২ লাখ টাকার চেক নেওয়ার অভিযোগে শরীয়তপুরের জাজিরার পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার সদ্য বদলি হওয়া ওসি শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও পরিদর্শক (তদন্ত) সুরুজ উদ্দিন আহম্মেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

আদেশটি শুক্রবার (১৬ জুন) সন্ধ্যায় শরীয়তপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পৌঁছায়। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ওই আদেশ দেওয়া হয়।

মোস্তাফিজুর রহমানকে চট্টগ্রাম ও সুরুজ উদ্দিনকে বরিশাল রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তারা শরীয়তপুরে কর্মরত।

শরীয়তপুরের নাওডোবা এলাকার ব্যবসায়ী সাদ্দাম চোকদার, বকুল চোকদার ও তাদের বড় ভাই আবু জাফর ঠান্ডু চোকদারসহ তাদের স্বজনদের একটি ছিনতাই মামলার ঘটনায় নির্যাতন করে ৭২ লাখ টাকার চেক নেওয়ার অভিযোগে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে ৭ জুন মোস্তাফিজুরকে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা থেকে বদলি করে জেলা পুলিশ অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া একই ঘটনায় আগামী ৯ জুলাইয়ের মধ্যে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও ওসি মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে পুলিশ সুপারকে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার সাইফুল হক মোবাইল ফোনে বলেন, পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের শরীয়তপুর থেকে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ, ভুক্তভোগী ও অভিযোগ সূত্রে জানায়, গত ২৩ মে দ্রুতবিচার আইনে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় একটি ছিনতাই মামলা হয়। মামলায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা আহম্মেদ চোকদার কান্দি এলাকার সাদ্দাম চোকদার, বকুল চোকদারসহ নয়জনকে আসামি করা হয়। সেই মামলায় ২৯ মে সাদ্দাম, বকুল, সাইদুল উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হন। জামিনে আসার পর ৩০ মে রাতে তারা এ মামলার আরেক আসামি আনোয়ারকে নিয়ে ঢাকা কেরানীগঞ্জ সাদ্দামের বন্ধু আলমগীর চোকদারের বাসায় যান। ওইদিন রাতে তথ্য পেয়ে সেই বাসায় হাজির হন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির ও ওসি মোস্তাফিজুর রহমান, জাজিরা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রুবেল বেপারীসহ ১০ থেকে ১২ পুলিশ সদস্য।

অভিযোগে বলা হয়, এ সময় সাদ্দাম তাদের জামিনের কাগজ দেখালে তা ছিঁড়ে ফেলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। পরে পুলিশ সাদ্দাম ও বকুলকে লাথি, কিল-ঘুষি, চড়থাপ্পড়সহ পুলিশের লাঠি (ডান্ডা), কাঠ, হাতুড়ি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। একপর্যায়ে প্লাস দিয়ে হাত ও পায়ের নখ তুলে ফেলা হয়। সাদ্দাম পানি পান করতে চাইলে ছোট ভাই বকুলকে দাঁড় করিয়ে মুখে প্রস্রাব করতে বলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল মনির। পরে সাদ্দামের শরীরে প্রস্রাব করেন বকুল। এমন নির্যাতন চলে রাত ১টা থেকে পরদিন ৩১ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত।

অভিযোগে জানা যায়, কিছুক্ষণ পর ওই চারজনকে গামছা ও কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে গাড়িতে করে জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর নিচে আনা হয়। পরে সাদ্দাম ও বকুল এবং সাইদুল ও আনোয়ারকে পৃথক দুই স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ওসি সাদ্দাম-বকুলকে বলেন, ‘সাইদুল-আনোয়ারকে ক্রসফায়ার দিয়ে দিয়েছি। তোরা ৭২ লাখ টাকা দিবি, তা না হলে তোদেরও ক্রসফায়ার দিয়ে দেওয়া হবে’। এভাবে সারাদিন রেখে রাতে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় এনে ৭২ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে বেত ও কাঠ, কোদালের বাট, লাঠি দিয়ে আবার বেধড়ক মারা হয় সাদ্দাম ও বকুলকে। সারারাত চলে এ নির্যাতন। এরপর টাকার জন্য বকুলের স্ত্রী সানজিদা, দুই বছরের সন্তান, বাবা রশিদ চোকদার, মা রমেলা ও চাচাতো ভাই আবু জাফর ঠান্ডুকে থানায় এনে সারারাত আটকে রাখা হয় এবং শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

অভিযোগে জানা যায়, পরে আত্মীয়-স্বজনরা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ওসির কাছে পাঁচটি চেকের মাধ্যমে ৭২ লাখ টাকা দিলে নির্যাতন থেকে মুক্তি মেলে সাদ্দাম ও বকুলের। এ দুদিন যন্ত্রণায় চিৎকার করলেও তাদের খাবার ও ওষুধ দেয়নি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ওসি।

অভিযোগকারীরা জানান, ১ জুন বিকেলে সাদ্দাম ও বকুলসহ চারজনকে শরীয়তপুর আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক রিমান্ড নামঞ্জুর করেন। ৬ জুন বিকেলে সাদ্দাম ও বকুলসহ চারজনই আদালত থেকে জামিন পায়।

এ নির্যাতনের ঘটনায় সাদ্দাম, বকুল ও তাদের বড় ভাই আবু জাফর ঠান্ডু জেলা পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দায়ের করেন।

ছিনতাই মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মে দুপুরে পদ্মা সেতু জাজিরা প্রান্তের নাওডোবা এলাকার এক্সপ্রেসওয়ের সোহাগ পরিবহন থেকে জাজিরা উপজেলার বাসিন্দা শাহীন আলম শেখ (২০) ও সেকেন্দার মাদবরকে (৫১) জোরপূর্বক নামিয়ে তাদের সঙ্গে থাকা বিদেশি ডলার, মোবাইলসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ছিনতাই করে নিয়ে যায় স্থানীয় সাদ্দাম চোকদার, বকুল চোকদারসহ ১০/১১ জন। ডলারসহ যার আনুমানিক মূল্য ২১ লাখ ১৫ হাজার ২৫০ টাকা ধরা হয়েছে। এ ঘটনায় ২৩ মে শাহীন আলম শেখ বাদী হয়ে পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানায় সাদ্দাম, বকুলসহ নয়জনের নাম নিয়ে অজ্ঞাত পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে একটি ছিনতাই মামলা করেন। তবে শাহীন আলম শেখ ও সাদ্দাম চোকদারের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে শত্রুতা রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

কালবেলা/এনএএস
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টোস্টমাস্টার্স ডিস্ট্রিক্ট ৪১-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-নেপালের একসঙ্গে পথচলা শুরু

নরসিংদীতে ৫ দিনে ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার

মাগুরায় স্কুলছাত্রীকে গলা কেটে হত্যায় যুবকের মৃত্যুদণ্ড

পুনঃপেনশন-ভাতার রায় বাস্তবায়নে গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ অবসরপ্রাপ্তদের

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি পেলেন ১৪৫ প্রদর্শক

ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ায় প্রাণ দিলেন স্বামী

ইয়ামালের প্রেমিকা কে এই গার্সিয়া, কীভাবে পরিচয়?

মাছ ধরতে গিয়ে সাপের কামড়ে প্রাণ গেল যুবকের

হামাসের নতুন প্রধান নির্বাচিত হলেন খলিল আল-হাইয়া

টানা ৩০ দিন ভেজানো কিশমিশ খেলে শরীরে যে ৫ পরিবর্তন আসতে পারে

১০

ইরানের হামলায় আহত বহু মার্কিন সেনার তথ্য গোপন রেখেছে পেন্টাগন

১১

জিয়াউল আহসানের রূপগঞ্জের বাড়িতে দুদকের অভিযান

১২

সেন্ট্রাল শরীয়াহ্ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস্ অব বাংলাদেশের সভা অনুষ্ঠিত

১৩

মায়ের কাছ থেকে যে ৮ বৈশিষ্ট্য পায় সন্তান

১৪

এনসিপির এক নেতা বহিষ্কার

১৫

রূপায়ণ সিটিতে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ, একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে মাতলেন দেশি-বিদেশিরা

১৬

‘এসএসসিতে গণিতে কেউ ফেল করবে না’ লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষকদের সমন্বিত উদ্যোগ

১৭

দিল্লির প্রেস মিনিস্টার হলেন সাংবাদিক সাইদুর রহমান

১৮

আইসিএবি’তে সাফা কুইজ, গণ বক্তৃতা ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা ২০২৫ অনুষ্ঠিত

১৯

আভিজাত্যপূর্ণ খাবারের নতুন ঠিকানা ‘দ্য গ্র্যান্ডিয়র’ ও ‘প্লেফিনিটি’

২০
X