

হলুদ সরিষার মাঠ যখন বাতাসে দুলতে থাকে, সেই দৃশ্য মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। এই হলুদের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা গ্রামীণ মেঠোপথ। এই নয়নাভিরাম প্রকৃতির সৌন্দর্য যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মনকে মুগ্ধ করবে। ফসলের মাঠের দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হলুদের রূপে মুগ্ধ হতে পারেন যে কেউ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠজুড়ে এখন হলুদের সমারোহ। প্রকৃতিতে ছড়ানো সরিষা ফুলের সুবাস আকৃষ্ট করছে সবাইকে। এমন নয়নাভিরাম দৃশ্য উপজেলাজুড়ে এখন সবার নজর কাড়ছে। সবুজের বুকে হলুদের এমন মনোরম দৃশ্যে চোখ এমনিতেই আটকে যায়। দৃষ্টিনন্দন সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে মাঠ। আর সেই সরিষার হলুদ ফুলে দোল খাচ্ছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন। অনুকূল আবহাওয়া, চাহিদা, সেইসঙ্গে স্থানীয় কৃষি অফিসের দিকনির্দেশনায় এই অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে সরিষা চাষে আগ্রহ বেড়েছে।
গত বছর আখাউড়ায় উৎপাদিত সরিষার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চলতি বছর কৃষকের মাঝে আবাদের আগ্রহ বাড়লেও উৎপাদন কিছুটা কমেছে। এর কারণ হিসেবে কৃষি অফিস বলছে, দিন দিন কৃষি জমিতে বালু ভরাটের কারণে আবাদি জমি কমছে। তবে উৎপাদন ও লক্ষ্যমাত্রা বিচারে চলতি অর্থবছরে এ উপজেলায় সরিষার বাজার মূল্য প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা হবে বলে মনে করছে কৃষি অফিস। গত বছর প্রতিমণ সরিষা বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়।
একটা সময় আখাউড়া উপজেলায় কৃষিজমিতে শুধু ধান চাষ হতো। এই ফসল চাষাবাদের মাঝের সময়ে কৃষিজমি ফাঁকা পড়ে থাকত। তবে এখন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সেখানে সরিষা, গম, ভুট্টা সূর্যমুখী ও পেঁয়াজ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ছাড়াও পতিত জমিতেও এ ধরনের শস্য উৎপাদনে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের মাঝে।
উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের কল্যাণপুর গ্রামের কৃষক ফারুক ভুঁইয়া জানান, তিনি ৩ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। সরিষা চাষ শেষে তিনি ওই জমিতে ধান বুনবেন। গত বছর তিনি ১ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছিলেন। সরিষাতে অধিক লাভবান হওয়ায় তিনি এ বছর তিন বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছেন।
উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামের কৃষক বিল্লাল মিয়া জানান, গত বছর সরিষা চাষে অধিক লাভ করায় তিনি এবারও তার ৪ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করছেন। ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই সরিষার ফলন পাওয়া সম্ভব। সরিষা চাষে বাড়তি সেচ বা সার, কীটনাশক লাগে না বললেই চলে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো আছে। কোনোরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবারও সরিষার বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাজারমূল্যের বিষয়েও কৃষকরা আশাবাদী।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ইসমাইল মুন্সি বলেন, সরিষা চাষে প্রতিবিঘা জমিতে ব্যয় হয় আড়াই তিন হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে প্রতিবিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভ হবে। সরিষা ক্ষেতকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সামান্য কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। ফলন ভালো হলে প্রতিবিঘা জমিতে ৫-৬ মণ সরিষা পাওয়া যাবে। তবে বেশি কুয়াশা সরিষা ক্ষেতের ক্ষতি করতে পারে।
আখাউড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা কালবেলাকে বলেন, সরিষা একটি স্বল্প খরচের লাভজনক ফসল। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হলে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত বছর আখাউড়ায় ৪৫২ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়, যা থেকে ৫ শত ১০ টন সরিষা উৎপাদন হয়। চলতি বছর কৃষকের মাঝে আবাদের আগ্রহ বাড়লেও উৎপাদন কিছুটা কম হবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, দিন দিন এ উপজেলায় কৃষিজমিতে বালু ভরাটের কারণে আবাদি জমি কমছে।
তিনি আরও বলেন, এ বছর ৪১০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এতে ৫ শত টন সরিষা উৎপাদন হবে বলে জানান তিনি। তবে উৎপাদন ও লক্ষ্যমাত্রা বিচারে চলতি অর্থবছরে এ উপজেলায় সরিষার বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা হবে বলে মনে করছেন ওই কর্মকর্তা। গত বছর প্রতিমণ সরিষা বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। এ বছরও একই দামে বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
মন্তব্য করুন