

চট্টগ্রাম নগরের একেবারে সন্নিকটে, তারপরেও যেন দেশের ভূখণ্ডের বাইরের এক স্থান জঙ্গল সলিমপুর। এখানে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি আর পাঁচটি এলাকার মতো নয়। পরিচয় ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। প্রবেশমুখে লোহার গেট, পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাহারা। অচেনা কাউকে দেখলেই মুহূর্তে চারপাশ থেকে ভেসে আসে সতর্কসংকেত। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই জঙ্গল সলিমপুরে চার দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে একটি অঘোষিত ‘অধিকৃত রাষ্ট্র’, যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন নয়, চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব নিয়ম।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এ দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ভৌগোলিকভাবে যতটা বিচ্ছিন্ন, অপরাধ কাঠামোয় ততটাই সংগঠিত। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি নিয়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর। পূর্বে হাটহাজারী, দক্ষিণে বায়েজিদ থানা।
জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এ খাসজমির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ বিপুল সম্পদের দখল, বণ্টন ও বাণিজ্য ঘিরেই গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাস, প্লট ব্যবসা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। পাহাড় কাটা থামেনি কখনোই, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা হয়েছে আরও পরিকল্পিত ও সংগঠিত। পাহাড় কেটে জমি সমতল করে প্লট আকারে বিক্রি, বিদ্যুৎ-পানি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা সব মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর আজ একটি পূর্ণাঙ্গ ছায়া অর্থনীতির কেন্দ্র, একটি ‘নিষিদ্ধ ভূখণ্ড’। এ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।
এলাকাটি সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে। পাহাড়ের ওপর থেকে নজরদারি করা হয় প্রতিটি চলাচলের ওপর। বাসিন্দাদের জন্য চালু করা হয়েছে পরিচয়পত্র ব্যবস্থা। বাইরের কেউ এলে বাসিন্দাকে গেট পর্যন্ত এসে পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। প্রশাসনের গাড়ি ঢুকলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ে, শুরু হয় সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ।
এ অঘোষিত রাষ্ট্রের ভয়াবহতা জাতীয় পর্যায়ে প্রথম আলোচনায় আসে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এর আগেও ২০২২ সালে র্যাব ও পুলিশের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের শেষদিকে হামলা করা হয় দুই সাংবাদিকের ওপর। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে এখন টিভির দুই সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। সে ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ বার্তাটি আসে গত সোমবার, ১৯ জানুয়ারি। অস্ত্র উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারের অভিযানে গিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭-এর ডিএডি আব্দুল মোতালেব নিহত হন। আহত হন আরও তিন র্যাব সদস্য ও একজন সোর্স। র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৯ জানুয়ারি বিকেল ৪টার দিকে অভিযান চলাকালে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জন সন্ত্রাসী সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়। পাহাড়ের সুবিধাজনক অবস্থান থেকে গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। তিন র্যাব সদস্য ও এক সোর্সকে ধরে নিয়ে পাহাড়ে নির্যাতন করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পরিচালিত অভিযানে র্যাবের ৫০ থেকে ৬০ জন সদস্য অংশ নেন। তিনি জানান, অভিযানের সময় র্যাব চাইলে পাল্টা আক্রমণ করতে পারত, তবে এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সদস্যরা সে সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকেন।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকা সন্ত্রাসীদের একটি নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। শিগগির সেখানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হবে। র্যাবের এক সদস্য হত্যার ঘটনায় তিনি বলেন, ঘটনাটি বর্তমানে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এর দায়দায়িত্ব র্যাবই বহন করবে।
র্যাব কর্মকর্তা নিহত ও একাধিক সদস্য আহত হওয়ার ঘটনার পর পুলিশ সুপার বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুর্বার ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে।
তিনি বলেন, এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এটি একটি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অভিযোগ উঠছে, সোমবারের হামলার পেছনে ইয়াছিন বাহিনী ও নুরুল হক ভান্ডারি জড়িত। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয় এলাকা দখলে সন্ত্রাসী প্রবেশ করছে, সবাই প্রতিহত করুন। ঠিক সেই সময় ইয়াছিন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা এসে হামলা চালায়। আরও জানা যায়, ইয়াছিন বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভয়ংকর শুটাররা, যারা বিদেশি অস্ত্র ব্যবহার করে পিস্তল ও নাইন এমএমের মতো ভারী অস্ত্র নিয়ে ভয়াবহ হামলা চালাতে সক্ষম। এসব সন্ত্রাসীর নিয়মিত অবস্থান আলীনগর ও নবীনগর এলাকায়।
সলিমপুরে অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তার যেভাবে: নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি শুরু করেন এবং দখল ধরে রাখতে গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী। দুর্গম পাহাড়ি অবস্থানের সুযোগে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাসজমি বিক্রি শুরু হয়। শুরুতে দুই শতক জায়গা বিক্রি হতো ২০ হাজার টাকায়। নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে এসব জায়গা কেনাবেচা চলে। প্লট গ্রহীতাদের ছিন্নমূল সমবায় সমিতি নামক সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করে বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নানা সেবা দেওয়ার কথা বলে নিয়মিত চাঁদা আদায় শুরু হয়। কিছুদিন পর প্লট বিক্রির টাকা ও পাহাড় দখল, চাঁদা নিয়ে এক সময় বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। এর মধ্যেই র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান আক্কাস। এর কিছুদিন পর আক্কাসের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা দল তৈরি করেন।
২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সরকারি দখলকৃত ভূমির বাণিজ্য এত বিস্তৃত হয় যে, প্রশাসন ২০২২ সালে অভিযান চালাতে বাধ্য হয়। যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৭৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং প্রায় ৭০০ একর জমি উদ্ধার করা হয়। দখলদার গড়ে তোলা পাহারাদার বাহিনী দিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তোলে। সরকারি খাসজমি হওয়ায় এলাকাটিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ ১১টি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে জমি পুনরুদ্ধার না হওয়ায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়নি।
একের পর এক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড: জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ ব্যবসা, মাদক, অস্ত্র ব্যবসাসহ আধিপত্য কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়েছে। ২০১৯-২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ১২টি বড় সংঘর্ষে ইয়াসিন গোষ্ঠীর আটজন নিহত ও ১৫ থেকে ২০ জন আহত এবং রোকন গোষ্ঠীর পাঁচজন নিহত ও ১২ থেকে ১৫ জন আহত হন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এক সংঘর্ষে একজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। ইয়াসিন পাহাড় কেটে ‘আলীনগর’ নামে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।
নিজের প্রভাব ধরে রাখতে ইয়াসিন একাধিক শক্তিশালী, সুসংগঠিত গ্রুপ গঠন করেছেন। এতে রয়েছে নারী সদস্য, হতদরিদ্র ও অশিক্ষিত স্থানীয়রা। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে ইয়াসিনের সম্পর্কের কারণে প্রশাসন প্রায়ই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ক্ষমতা ও ভোট নিয়ন্ত্রণে ইয়াসিন সাইনবোর্ড ব্যবহার করে। আলাদা আলাদা গুপ্ত গ্রুপ সম্পূর্ণরূপে তার আদেশ মেনে চলে।
ইয়াছিনের প্রতিপক্ষ যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন। সাম্প্রতিক সময়ে রোকনের অনুসারীরা আলীনগরে প্রবেশ করতে গিয়ে ইয়াছিনের অনুসারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। দুপক্ষ দেশি-বিদেশি অস্ত্র ব্যবহার করে। সম্প্রতি রোকনের একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও তিনি তা ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করেছেন। স্থানীয়দের মতে, জঙ্গল সলিমপুর এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতীক। প্রশাসনের আইনও চলতে থাকে, আবার ‘সমিতি আইন’ও।
মন্তব্য করুন