

পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা, দূরে মেঘে ঢাকা সবুজ পাহাড়ের সারি আর নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা দুধসাদা পাথর। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এমন মায়াবী মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর।
ঈদুল আজহার ছুটিতে সেই সাদাপাথর এখন পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন হাজারো ভ্রমণপিপাসু। নগর জীবনের ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছু নির্মল সময় কাটাতে ব্যস্ত তারা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাদাপাথরের স্বচ্ছ পানিতে জলকেলিতে মেতেছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ নৌকায় চড়ে উপভোগ করছেন পাহাড়ঘেরা নদীর সৌন্দর্য, কেউবা স্মৃতিময় মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করছেন। আবার অনেককে দেখা যায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে পুরো এলাকা ঘুরে দেখতে। চারদিকে যেন উৎসবের আমেজ। পর্যটকের ভিড়ে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। ফটোগ্রাফার, নৌকার মাঝি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবার মুখেই এখন হাসি।
পর্যটন ঘাটের ইজারাদার কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার পর্যটক সাদাপাথরে আসছেন। পর্যটন ঘাট থেকে মূল স্পটে যেতে প্রতি নৌকায় সর্বোচ্চ আটজন যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। যাওয়া-আসার জন্য জনপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা।
বরিশাল থেকে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী ইমন আহমদ কালবেলাকে বলেন, সাদাপাথরের সৌন্দর্যের কথা অনেক শুনেছি। তবে বাস্তবে এসে দেখলাম, এটি কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। এখানে এসে মন ভরে গেছে।
নরসিংদী থেকে আসা পর্যটক ফাহিম মাহমুদ বলেন, পাহাড়ি ঝরনার শীতল পানিতে নেমে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতির মাঝেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছি।
চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা তানজিলা আক্তার কালবেলাকে বলেন, পরিবার নিয়ে সাদাপাথরে এসেছি। প্রকৃতির এত সুন্দর পরিবেশে সময় কাটিয়ে খুব ভালো লাগছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সন্তোষজনক মনে হয়েছে।
পর্যটকের ভিড়ে চাঙা হয়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতিও। কোম্পানীগঞ্জ ফটোগ্রাফার সোসাইটির সদস্য ইকবাল হোসেন বলেন, 'আগের তুলনায় পর্যটক অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছবি তুলছেন। ফলে আমাদের কাজও বেড়েছে।'
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা সাবিহা রহমান কালবেলাকে বলেন, নদীর স্বচ্ছ পানি আর চারপাশের পাহাড়ের দৃশ্য মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দেয়। এখানে এসে ঈদের আনন্দ যেন আরও বেড়ে গেছে।
নৌকার মাঝি মজিবুর রহমান বলেন, ভালো আবহাওয়া আর ঈদের ছুটির কারণে এবার পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিদিন শত শত মানুষকে নৌকায় করে মূল স্পটে নিয়ে যাচ্ছি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুর মিয়া জানান, ঈদের তৃতীয় দিন থেকে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
নৌকার মাঝি সেবুল আহমদ বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিনে ভিড় তুলনামূলক কম ছিল। তবে পরবর্তী দিনগুলোতে পর্যটকের চাপ অনেক বেড়েছে। এতে আমাদের আয়ও বেড়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, পাহাড়-নদী আর শ্বেত-শুভ্র পাথরের অনন্য সমন্বয়ে সাদাপাথর এখন ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পর্যটন সুবিধা আরও উন্নত করা গেলে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সাদাপাথরের আবেদন ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
সাদাপাথর ট্যুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ বকুল সাহা কালবেলাকে বলেন, পর্যটনকেন্দ্রে পৃথক পৃথক টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। যেকোনো দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুত টিম রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবির সঙ্গেও সমন্বয় রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টিসহ বিভিন্ন প্রতারণা সম্পর্কে পর্যটকদের মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুজন চন্দ্র কর্মকার কালবেলাকে বলেন, সাদাপাথর এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এখনও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া কালবেলাকে বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ, পুলিশ ও বিজিবির নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত ব্যাপারে সার্বক্ষণিক মাইকিং, পরিদর্শন, পর্যবেক্ষন করছেন পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি সতর্কতায় প্রস্তুত রয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাও।