

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার প্রকৃতি যেন ল্যান্টানা ফুলের নানা রঙে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। কুমিল্লা-বাগড়া সড়কের পাশে ও গোমতী নদীর পাড়ে নজর কাড়ছে এ ফুলের চোখজুড়ানো রঙিন হাসি।
ছোট ছোট ফুলের গুচ্ছে লাল, কমলা, হলুদ, গোলাপি, সাদা আর বেগুনি রঙের মায়াবী মিশ্রণ যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক অপূর্ব জলরঙের ছবি।
এক একটি ফুল যেন নিজেই একেকটি রঙের গল্প। একই গুচ্ছে রঙের পরিবর্তন, কখনো হলুদ থেকে কমলা, আবার কমলা থেকে লালে রূপান্তর, প্রকৃতির এই নীরব জাদু মুগ্ধ করে ফুলপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের। ফুলগুলোতে রোদ পড়লে আরও সতেজ হয়ে ওঠে। এ সৌন্দর্যে প্রকৃতিও যেন সেজে ওঠে আরও প্রাণবন্ত রঙিন সাজে।
জানা গেছে, ল্যান্টানা, পুটুস বা ছত্রা উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম ল্যান্টানা ক্যামেরা। এ উদ্ভিদটি তার বৈজ্ঞানিক নামেই বেশ পরিচিত। এটি ভারবেনাসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ প্রজাতি। এর আদি নিবাস ক্রান্তীয় আমেরিকা। এটি খরা সহিষ্ণু, কাঁটাযুক্ত এবং ঝোপালো চিরসবুজ উদ্ভিদ। এটি একটি আগ্রাসী উদ্ভিদ। এটি একটি খুব অভিযোজনযোগ্য প্রজাতি, যা বিভিন্ন ধরনের বাস্তুতন্ত্রে বসবাস করতে পারে।
ল্যান্টানা ক্যামেরা উদ্ভিদটি খুব সহজেই জন্মায় এবং যেকোনো পরিবেশে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারে। এটি শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে বেশ পরিচিত। তবে এটি অন্যান্য উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ছড়ায়। এই উদ্ভিদে হলুদ, লাল, কমলা, বেগুনি, গোলাপি ও সাদা রঙের মিশ্রণে ফুল ফুটে এবং পরে রঙ বদলায়। অনেক প্রজাতির প্রজাপতি এ ফুলের মধু আহার হিসেবে গ্রহণ করে। এটি বাংলাদেশে বনফুল, পুটুস বা ছত্রা নামে পরিচিত।
উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ল্যান্টানা ক্যামেরা শুধুই শোভাবর্ধন করে না, এর রয়েছে ভেষজ গুণাগুণ। ভারতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এ উদ্ভিদের পাতায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, ছত্রাকনাশক এবং কীটনাশক গুণাগুণ বিদ্যমান। এ উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ ক্যানসার, ত্বকের চুলকানি, কুষ্ঠরোগ, চিকেন পক্স, হাম, হাঁপানি, আলসারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য ঐতিহ্যগতভাবে ভেষজ ওষুধে ব্যবহার করা হয়েছে।
উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের হরিমঙ্গল এলাকার ফুলপ্রেমী মজিবুর রহমান বলেন, এ ফুলের দিকে তাকালে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই রঙ নিয়ে খেলছে। এক ফুলেই এত রঙ, এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য সুন্দর। কুমিল্লা-বাগড়া সড়কের অনেক স্থানেই এই ফুলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে। চলতি পথে এ ফুলের সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়।
কলেজ শিক্ষার্থী রাফাতুল ইসলাম রাফি বলেন, আগে এই গাছগুলোকে তেমন গুরুত্ব দিতাম না। তবে সচরাচর এদের ফুল দেখতে দেখতে এদের ফুলের প্রেমে পড়ে গেছি। এদের ফুটন্ত ফুল প্রকৃতিসহ পুরো পরিবেশটাই বদলে দেয়। বছরের অধিকাংশ সময়ই এ গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। আমাদের বাড়ির পাশের সড়কের কিছু কিছু স্থানে এ গাছ রয়েছে। আসা-যাওয়ার পথে এ ফুলের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও ফুলপ্রেমী ফারজানা বাহার বলেন, ল্যান্টানার আশপাশে সবসময় প্রজাপতি আর মৌমাছির ভিড় থাকে। ফুল ও রঙিন ডানার প্রজাপতির মেলবন্ধনের দৃশ্য আরও বেশি ভালো লাগে। এদের ফুলের নানা রঙ পুরো পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, ল্যান্টানা বা পুটুস গাছ প্রকৃতির এক উপহার। একই গুচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন রঙে ফুল ফোটে বলে এ ফুল মানুষকে আকৃষ্ট করে। এ ফুলের সৌন্দর্য যেমন মনকে প্রশান্ত করে, তেমনি সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে এটি কিছু রোগ নিরাময়েও সহায়ক হতে পারে। তবে এই উদ্ভিদের বেশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এজন্য এটিকে সরাসরি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।