

কবর খনন করতে গিয়ে অলৌকিক চিহ্নযুক্ত হাজার বছরের পুরোনো ৫টি মূল্যবান পাথর সদৃশ বস্তু (তসবি) পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে অলৌকিক কারণ দেখিয়ে নিহতের পরিবার সেগুলো পুনরায় কবরে পুঁতে রাখার দাবি করে। তবে তাদের সে দাবি মানতে নারাজ স্থানীয়রা।
স্থানীয়দে অভিযোগ, মূল্যবান এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আত্মসাৎ করা হয়েছে। আর এমন অভিযোগে গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
ঘটনাটি ঘটেছে নওগাঁর পোরশা উপজেলার ঘাটনগর ইউনিয়নের কালুকান্দর গ্রামে। গ্রামের কাউকেই না জানিয়ে ভোরের দিকে একা একা কবরে পাথর রেখে আসার এই দাবি বিশ্বাস করছেন না স্থানীয়রা। তাদের ধারণা, মূল্যবান এই পুরাকীর্তি পাচার বা আত্মসাৎ করার উদ্দেশেই এই অলৌকিকতার নাটক সাজানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাস ছয়েক আগে কালুকান্দর গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফা মণ্ডল মারা যান। গ্রামের গোরস্থানে তার কবর খননের দায়িত্ব পান বাহার আলী, শরিফুল ইসলাম ও শফিউদ্দিন নামে তিন ব্যক্তি। এক কোমর সমপরিমাণ মাটি খুঁড়তেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কালো, সাদা, ধূসর ও বাদামি রঙের ৫টি প্রাচীন পাথর সদৃশ বস্তু। বস্তুগুলোর নিচের অংশে ‘আল্লাহু’ লেখা ছিল বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। ঐতিহাসিক এই নিদর্শনগুলো দেখার পর কৌতূহলী গ্রামবাসী তা সাময়িকভাবে বাহার আলীর কাছে জমা রাখেন।
দাফন সম্পন্ন হওয়ার চার দিন পর মোস্তফা মণ্ডলের বড় ছেলে ইউনুস আলী তার মা ও ভাইদের দেখানোর কথা বলে বাহার আলীর কাছ থেকে পাথরগুলো নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।
কবর খোঁড়া ব্যক্তি শরিফুল ইসলাম বলেন, গ্রামের মানুষের ডাকে আমি এখানে কবর খুঁড়তে আসি। কবরটি যখন এক কোমর পর্যন্ত খোঁড়া হয়, তখন কোদালে কয়েক বার শক্ত কিছুর আঘাতের শব্দ পাই। এরপর সাবধানে মাটি সরিয়ে সেখান থেকে পাথর জাতীয় পাঁচটি জিনিস উদ্ধার করি এবং উপস্থিত বাহার আলী মন্ডল নামের এক মুরুব্বিকে তা বুঝিয়ে দিই।
বাহার আলী মন্ডল বলেন, পাঁচটি পাথর আমার কাছেই ছিল। পরে নিহত মোস্তফার ছেলে ইউনুস আলী ভোরের দিকে এসে আমার কাছ থেকে পাথরগুলো নিয়ে যায়। সে বলেছিল পাথরগুলো আবার কবরে দিয়ে দেবে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, যেহেতু গোরস্থানটি আমাদের সমাজের সবার কবরস্থান এবং এই কবরস্থান থেকে পাথরগুলো পাওয়া গেছে সেটি উদ্ধার করা হোক, কারণ ওটা সবার সম্পত্তি।
তিনি আরও বলেন, এই সমস্যার সমাধানে গ্রামে তিনবার এবং ইউনিয়ন কাউন্সিলে একবার শালিস ডাকা হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি শুধু প্রথম দিন উপস্থিত হয়ে পরে আর আসেনি। আমাদের পক্ষে তো আর জোর করে কাউকে বাড়ি থেকে তুলে আনা সম্ভব নয়। এখন উনি দাবি করছেন পাথরগুলো নাকি আবার কবরস্থানেই রেখে এসেছেন, কিন্তু আমাদের তো আর নিজেদের ইচ্ছামতো কবর খোঁড়ার এখতিয়ার নেই। আমরা শুধু চাচ্ছি জিনিসটা বের করে সবার সামনে আনা হোক, যেন মানুষের মনের সন্দেহ ও ভুলভ্রান্তি দূর হয়ে যায়।
তবে ইউনুস আলী মুঠোফোনে বলেন, বুজুর্গ ও ধর্মীয় মুরব্বিদের পরামর্শে ফজরের নামাজের পর তিনি একা গিয়ে পাথরগুলো পুনরায় তার বাবার কবরের ভেতরেই রেখে এসেছেন।
ইউনুসের মা আবেদা জানান, ধর্মীয় মুরুব্বিদের কথামতোই তার ছেলে পাথরগুলো কবরে রেখে এসেছে। তিনি তার স্বামীর কবর পুনরায় খনন না করার জন্য সবার কাছে অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ও জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ফজলুর করিম আরজু বলেন, পোরশার ওই অঞ্চলে মাটির নিচে হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অস্তিত্ব রয়েছে। কবর থেকে পাওয়া বস্তুগুলোও কোনো প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। স্থানীয় প্রশাসন সহযোগিতা করলে ওই অঞ্চলে খননকাজ চালিয়ে আরও পুরাকীর্তি উদ্ধার করা সম্ভব।
পোরশা থানার অফিসার ইনাচার্জ জিয়াউর রহমান মুঠোফোনে কালবেলাকে বলেন, একটা অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের নজরদারি আছে, যেন এলাকায় কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে।