জীবিত থেকেও ভোটার আইডির মৃত তালিকায় নাম উঠেছে একই পরিবারের তিনজন নারীর। এতে করে ওই বিধবা ও বয়স্কা নারীরা সরকারি ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জামালপুরে সরিষাবাড়ী উপজেলার মহাদান ইউনিয়নের হিরণ্য বাড়ি এলাকায় ভুক্তভোগীদের বাড়ি।
ভুক্তভোগী নারীরা হলেন- আলমগীরের স্ত্রী মোছা. আঞ্জুয়ারা (৩৯), মৃত মেহার আলীর স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৬৪) ও মৃত রফিকুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. জাহানারা (৫২)।
আঞ্জুয়ারা জানান, গত ৬ বছর যাবৎ ভোটার আইডি তালিকায় আমাকে মৃত দেখানো হয়। আমি ভোটার আইডিতে মৃত হওয়ায় আমার ছেলেমেয়েদের স্কুলের উপবৃত্তি করাতে পারছি না। এ ছাড়াও ভিজিডি, ভিজিএফ, টিসিবিসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে সমস্যা হচ্ছে। আমি মৃত বলে আমার স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পাইনি। আমি নির্বাচন অফিসে গিয়েছিলাম। তবুও আমার আইডি তারা ঠিক করে দেয়নি। তারা এই এলাকার তথ্য সংগ্রহকারী শফিকুল মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। পরে আমি ভোটার আইডি ঠিক করার জন্য তাকে টাকাও দিয়েছি। তবুও সে ঠিক করে দেয়নি।
মরিয়ম বেগম বলেন, আমার স্বামী-সন্তান কেউ নেই। আমার বয়স ৬০ বছরের বেশি। আমি এখন কাজ করতে পারি না। সরকার একটি বিধবা ভাতার কার্ড দিয়েছিল। সেটিও আমি মৃত বলে বন্ধ করে দিয়েছে। গত ৮ বছর যাবৎ আমি মারা গেছি, এটাই ভোটার আইডিতে দেখায়। আমি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না। আমি এবার ভোটও দিতে পারিনি। দয়া করে আপনারা আমার ভোটার আইডিটি ঠিক করে দিন।
জাহানারা বলেন, গত ৭ বছর যাবত ভোটার আইডিতে আমাকে মৃত দেখানো হয়। আমি দিব্বি বেঁচে আছি। তারা কীভাবে আমাকে মৃত বানায় আমি বুঝি না। তাদের এই ভুলের কারণে আজ আমি এই ভোটার আইডি দিয়ে কিছুই করতে পারছি না। যেখানেই কোনো কিছুর জন্য যাই, তারাই বলে আপনার ভোটার আইডিতে আপনি মৃত। এই আইডি দিয়ে কোনো কাজই আপনি করতে পারবেন না। আইডি কার্ড ঠিক করার জন্য শফিকুল মাস্টারের পেছনে অনেক ঘুরেছি। সে এই কার্ডটি ঠিক করে দিচ্ছে না।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত তথ্য সংগ্রহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে বলেন, এটা আমারই ভুল। আমি এজন্য অপরাধী। আমি এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের কাজ করে দেব।
সাবেক ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন, ঐ সকল নারীদের মৃত দেখিয়ে তাদের সুবিধাভোগী বিধবা ভাতার কার্ড অন্যত্র দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ আমার সময় হয়নি।
বর্তমান ইউপি সদস্য নূরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনা যখন ঘটেছে তখন আমি মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত ছিলাম না। এইটা দুর্নীতি করছে দুই ব্যক্তি। একজন হলেন সাবেক ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন, আরেকজন ভোটার তালিকা তথ্য সংগ্রহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম।
ভোটার আইডি ও বিধবা কার্ডের বিষয়ে মহাদান ইউপি চেয়ারম্যান এ.কে.এম আনিছুর রহমান জুয়েল বলেন, ভোটার আইডিতে তিনজনকে মৃত দেখালেও তারা এখনো জীবিত। যারা তাদের তথ্য সংগ্রহ করেছে তারাই এই ভুলটি করেছে।
জীবিত মরিয়ম বেগমকে মৃত বানিয়ে তার বিধবা ভাতার কার্ড বাতিল করে অন্যজনকে দেওয়ার বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার ইউনিয়ন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন।
উপজেলা নির্বাচন অফিসার সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, তারা আমার কাছে আসলে আমি প্রথমেই তাদের আইডি কার্ডের বিষয়টি সমাধান করব। তারা যেন দ্রুত নাগরিক সেবা পান। এছাড়াও অভিযুক্ত তথ্য সংগ্রহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলামের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি ওই শিক্ষককে আমার স্টাফদের মাধ্যমে আসতে বলেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। এর সত্যতা পেলে ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে আলোচনা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
ভোটার আইডি ও বিধবা কার্ড প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার বলেন, তারা অফিসে এসে বললে এবং আবেদন করলে তাদের আইডি কার্ড সংশোধন ও বিধবা ভাতার বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন