

এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে পল্টন থানার মানব পাচার আইনে এক মামলায় পুনরায় ৬ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত।
রোববার (২৯ মার্চ) তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এ আদেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
এর আগে একই মামলায় গত ২৪ মার্চ তাকে ৫ দিনের রিমান্ড দেন আদালত।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন।
তিনি বলেন, এই মামলার এজাহারে তার নাম আছে এবং এই চক্রের সাথে জড়িত। ১/১১-এর সময়ে এই আসামি ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের হেনস্তা করতেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ক্ষমতায় নিতে তিনি অনেক সহযোগিতা করেছেন। এসব কর্মের উপহার সরূপ সে এমপি হয়েছেন, ব্যবসা করেছেন এবং অনেক সুবিধা পেয়েছেন। সুতরাং তদন্তের স্বার্থে তাকে ৭ দিনের রিমান্ড দরকার।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ওহিদুল ইসলাম সজিবসহ অনেকেই রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন শুনানি করেন। ওহিদুল ইসলাম সজীব বলেন, ইতোমধ্যে সে ৫ দিনের রিমান্ড পেয়েছেন। এফআইআরে নাম ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। পাঁচ দিনের রিমান্ডে তদন্ত কর্মকর্তা কী পেলেন। আদালতকে কী দিতে পারলেন তা কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ স্পষ্ট করতে পারেননি। আইন অনুযায়ী কেন রিমান্ডে নেওয়া হবে। এ মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট আসছে সম্প্রতি। এরপরেও তাকে কেন রিমান্ড দেওয়া হবে?
তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার যে অভিযোগ সেটা ম্যান টু ম্যান নেওয়ার প্রমাণ থাকতে হবে। নিজে উপস্থিত থেকে চাঁদা চাইতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা কিন্তু হয়নি। সুতরাং রিমান্ডের আবেদন আইনানুগ না। শুধু অপমান করার জন্য তাকে বারবার রিমান্ড দেওয়া হচ্ছে। তার বয়স ৭২ বছর, তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। রিমান্ডে দেওয়ার আগে ডাক্তারি পরীক্ষা করতে হবে। এর আগের রিমান্ডে নেওয়ার সময়ে করা হয়েছে কি না জানিনা।
আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, এ মামলায় একাধিক আসামি জামিনে আছেন। এক্ষেত্রে আমরাও জামিন চাই। কারণ আইন সবার ক্ষেত্রে একই হওয়ার কথা।
জবাবে পিপি বলেন, এফআইয়ার শুধু তথ্য, এটা মূল বিষয় না। বাদী স্পষ্টভাবে বলেছেন আসামির নাম। কিছু কিছু এজেন্সিকে এ আসামিসহ অন্যরা বলেছে, আমাদের সিন্ডিকেটের সদস্য না হলে ব্যবসা করা যাবেনা। সুতরাং এসব আমরা তদন্তে পেয়েছি, রিমান্ডে কী জন্য নেওয়া হবে সেটা আদালত বিবেচনা করবে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাদী আলতাব খান ‘আফিয়া ওভারসীজ’ নামক রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, ১ ও ২ নম্বর বিবাদীসহ একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট মাফিয়া চক্র বিদেশের শ্রমবাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ফেলে। সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ৭৯ হাজার ৪৯০ টাকা থাকলেও, এই সিন্ডিকেট প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা করে আদায় করত। বাদীকে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই কাজ করতে বাধ্য করা হত। এভাবে ৮৪১ জন কর্মীর বিপরীতে বাদীর কাছ থেকে জোরপূর্বক ১২ কোটি ৫৬ লাখ ১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া সিন্ডিকেটের অসহযোগিতার কারণে বাদীর আরও ২০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়। এই চক্রটি বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা হিসেবে আদায় করেছে। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, বিবাদী পক্ষ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাচার করে তাদের আটকে রাখা, কাজ না দেওয়া এবং বেতন না দিয়ে জোরপূর্বক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। অনেক শ্রমিককে মানবেতর অবস্থায় শ্রম শোষণের শিকার হতে হয়েছে।
এদিকে ডিবি পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) মো. রায়হানুর রহমান আদালতকে জানান, আগের ৫ দিনের রিমান্ডে আসামির কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। বিশেষ করে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি প্রাপ্ত এজেন্সিগুলোর নির্বাচনের পদ্ধতি, FWCMS-এর অপারেশনাল কার্যক্রম, ২০২২-২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় পাঠানো কর্মীদের প্রকৃত তথ্য এবং আত্মসাৎকৃত বিশাল অঙ্কের টাকা উদ্ধারের লক্ষ্যে তাকে পুনরায় ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন।