

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এ জ্যেষ্ঠতার গ্রেডেশন উপেক্ষা করে ১৭ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধা বা পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পর্ষদের সিদ্ধান্ত, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর লিখিত নির্দেশনা এবং কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী মহল এ প্রচেষ্টায় সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত বিটিসিএলের ২৩৪তম পর্ষদ সভায় ওই ১৭ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ বিবেচনায় পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কর্মকর্তাদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ২৩৫তম পর্ষদ সভায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়।
২৩৫তম পর্ষদ সভায় ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে পদোন্নতির তফসিলে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে জ্যেষ্ঠতার গ্রেডেশন বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়ব উপস্থিত ছিলেন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধানে তিনি লিখিতভাবেও একই নির্দেশনা দেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব স্পষ্ট নির্দেশনার পরও ড. মো. আনোয়ার হোসেন মাসুদ এবং বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদসহ একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ফের ওই ১৭ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধা দিতে তৎপর হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দপ্তরে সংযুক্তিতে কর্মরত মো. আনোয়ার পারভেজ এই তৎপরতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর নাম ব্যবহার করে বিটিসিএলের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন।
সূত্র জানায়, ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বিসিএস টেলিকম সমিতির সভাপতি ড. মো. আনোয়ার হোসেন মাসুদকে গুরুত্বপূর্ণ আইপি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা এবং একই সময়ে ডিএমডি (এম অ্যান্ড ও) পদ পাওয়া মো. মামুনুর রশীদকে পরবর্তীতে বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনেও মো. আনোয়ার পারভেজ বিভিন্ন পর্যায়ে সুপারিশ ও প্রভাব খাটান—এমন অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র মতে, এসব বিষয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর নজরে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং মো. আনোয়ার পারভেজকে তার দপ্তর থেকে প্রত্যাহার করে পুনরায় বিটিসিএলে ফেরত পাঠানো হয়।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন মাসুদের বিরুদ্ধে নিজের ভাগ্নি জামাই সাদিকুর রহমান মাবুদকে সুবিধা দিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাদিকুর রহমান মাবুদ রাজশাহীর সাবেক মেয়র খাইরুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজশাহী অঞ্চলে বিটিসিএলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
বর্তমানে ড. মো. আনোয়ার হোসেন মাসুদ বিটিসিএলের আইপি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, অতিরিক্ত দায়িত্বে সিজিএম (প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) এবং সিজিএম (বৈদেশিক টেলিকম অঞ্চল) পদে রয়েছেন। একই ব্যক্তির হাতে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব কেন্দ্রীভূত থাকাকে স্বার্থের দ্বন্দ্বের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া পদোন্নতি প্রত্যাশীদের তালিকায় থাকা জয়ীতা সেন রিম্পীর নাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং ২০২৫ সালের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়েই তাঁকে পদোন্নতির তালিকায় রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, ২০২২ সালে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের আস্থাভাজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. রফিকুল মতিন তফসিলবহির্ভূত একটি পরীক্ষার মাধ্যমে একই ১৭ জন কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেন। ওই প্রক্রিয়ায় তৎকালীন কোম্পানি সচিব ড. মো. আনোয়ার হোসেন মাসুদ জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্ষদের সিদ্ধান্ত, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর লিখিত নির্দেশনা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ উপেক্ষা করে যদি একই ১৭ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকে, তবে তা বিটিসিএলের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারের সংস্কার অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
মন্তব্য করুন