সাগরে মাছ শিকারের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এই দুবলার চর। হিন্দুধর্মের পুণ্যস্নান, রাসমেলা এবং হরিণের জন্য বহুল পরিচিত হওয়ায় এই চরে প্রতি বছর আগমন ঘটে লক্ষাধিক মানুষের। এত মানুষের চলাচল এই চরে থাকলেও নেই বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা। যে কারণে মাওয়ালি, বাওয়ালি, বনজীবী, মৎসজীবীসহ দুবলার চরে আগত পর্যটকরা পড়েন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার পর এই এলাকার মানুষের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে র্যাব। সাগরের নোনা পানির জটিলতাসহ নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দুবলার চরে আগতদের পানির দুঃখ দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে র্যাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় র্যাবের তত্ত্বাবধানে দুবলার চরে স্থাপিত হয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। প্রতিদিন গড়ে চব্বিশ হাজার লিটার পানি পরিশোধন করার সক্ষমতা সম্পন্ন এই ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট উদ্বোধন করা হবে ২৬ নভেম্বর।
সম্প্রতি র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল মো. মাহাবুব আলম ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে সুন্দরবনের দুবলার চর পরিদর্শন করেন। এ সময় র্যাব সদর দপ্তরের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকতাগণ, বনবিভাগের কর্মকর্তারা, স্থানীয় জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিগণও উপস্থিত ছিলেন।
র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও নভেম্বর মাসে দুবলার চরকেন্দ্রিক হিন্দুদের রাশ উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই রাশ মেলায় আগত পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের উপস্থিতিতে আগামী ২৬ নভেম্বর র্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, পানি সংগ্রহের স্থান থেকে ১৫টি ডিস্ট্রিবিউশন পয়েন্টের মাধ্যমে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির সুবিধা ভোগ করবেন। তিনি বলেন, দুবলার চরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে দুবলার চর ও এর আশেপাশের এলাকার মৎসজীবীসহ অন্যান্য পেশাজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ব্যবসায়ী, পুণ্যার্থী, পর্যটক ও সাধারণ মানুষজনের বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির সংকট দূর করা সম্ভব হবে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন একসময় ছিল জলদস্যুদের অভয়ারণ্য। জলদস্যুরা সুন্দরবনের বিভিন্ন পেশাজীবীদের খুন, অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়সহ নির্যাতন ও নিপীড়নের মাধ্যমে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। গহীন সুন্দরবরের পুরো অঞ্চল জুড়েই ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে সেখানে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল জলদস্যুরা। সুন্দরবনের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনরক্ষা, মৎস ও বনজ সম্পদের সংরক্ষণ সর্বোপরি সুন্দরবনকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১২ সালে র্যাব ফোর্সেসকে লিড এ্যাজেন্সি করে তৈরি হয় টাস্কফোর্স। লাগাতার অভিযানের পর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে আত্মসমর্পন করা জলদস্যুদের পাশে রয়েছে র্যাব।
সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হওয়ায় উপকলীয় এলাকায় চুরি, ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে সেখানে মাওয়ালি, বাওয়ালি, বনজীবী, মৎসজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নির্ভয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারছে। এ ছাড়াও সুন্দরবনের মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে পূর্বের তুলনায় দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে চালু হচ্ছে এই ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট।
মন্তব্য করুন