

মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের গর্জন আর স্টেডিয়ামজুড়ে উড়ন্ত সমব্রেরো হ্যাট, সব মিলিয়ে যেন এক উৎসবের নগরী। উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকো আজ নেমেছে সেই পুরোনো আগ্রাসন নিয়ে। ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তি রবার্তো ব্যাজিও, কাফু আর রবার্তো কার্লোসদের উপস্থিতিতে মাঠের প্রতিটি ঘাস যেন আজ প্রাণ পেয়েছে। শুরু থেকেই মেক্সিকোর দুর্বার আক্রমণ—বিশ্বকাপের প্রথম গোল আর ছন্দময় ফুটবল, এ যেন এক অমোঘ ফুটবলীয় মহাকাব্য!
শুরু থেকেই মেক্সিকো যেন তৃতীয় গিয়ারে আক্রমণ সাজাতে শুরু করে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিজেদের অর্ধেই চেপে ধরে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজকরা। প্রথম তিন মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকা বলের দেখা পেলেও মুহূর্তের মধ্যেই তা হারিয়েও ফেলে।
ম্যাচের মাত্র ৫ মিনিটেই গোলের জন্য জোরালো এক প্রচেষ্টা চালায় মেক্সিকো। ডান প্রান্ত দিয়ে দৌড়ে গিয়ে বক্সের ঠিক বাইরে বল পেলেন রাউল হিমেনেজ। দৌড় থামানোর আগেই বুলেট গতির এক ভলি! তবে দক্ষিণ আফ্রিকার গোলকিপার রনউইন উইলিয়ামস দারুণ দক্ষতায় ডান হাত দিয়ে বলটি বাইরে ঠেলে দিয়ে দলকে বাঁচালেন।
মেক্সিকোর দুর্বার আক্রমণের সামনে বেশিক্ষণ জায় অক্ষণ রাখতে পারলেন কই আর দক্ষিণ আফ্রিকার গোলকিপার। দুই প্রান্ত দিয়ে একের পর এক ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল মেক্সিকান আক্রমণ। নিরলস এই চাপের মুখে ভেঙে পড়ল দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণ। নবম মিনিটেই জুলিয়ান কুইনোনেসের এক জোরালো শট খুঁজে নিল জালের ঠিকানা! ২০২৬ বিশ্বকাপও দেখল প্রথম গোল।
২০১০ সালের সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ আর ২০২৬-এর আজকের এই মুহূর্ত যেন এক বৃত্তের পূর্ণতা! ঠিক ষোল বছর আগে জোহানেসবার্গের সকার সিটিতে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার করা সেই গোলটি মেক্সিকানদের বুকে হাহাকার জাগিয়েছিল, আর আজ সেই মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে উল্টো ছবি। ইতিহাসের অদ্ভুত এক পুনরাবৃত্তিই যেন ঘটল—২০১০ সালে মেক্সিকোর বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার শুরু করা সেই রূপকথার গোলটি আজ ঠিক উল্টে গেল। এবার স্বাগতিক মেক্সিকোই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম গোলটি আদায় করে নিয়ে লিখল প্রতিশোধের এক নতুন আখ্যান। যেন ফুটবল বিধাতা আজ দীর্ঘ ১৬ বছরের পুরোনো এক হিসাব মিলিয়ে দিলেন!
৯ মিনিটে কুইনোনেসের গোলটি কেবল মেক্সিকোর জয়জয়কারই নয়, বরং ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ২০ বছরের ইতিহাসে দ্রুততম উদ্বোধনী গোলগুলোর একটি। ২০০৬ সালে জার্মানি ও কোস্টারিকার উদ্বোধনী ম্যাচে ফিলিপ লাম মাত্র ৬ মিনিটে গোল করেছিলেন; এরপর থেকে বিশ্বকাপে প্রথম গোল হওয়ার ক্ষেত্রে এটিই দ্রুততম সময়ের রেকর্ড। অর্থাৎ, দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ কুইনোনাস বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নাম লেখালেন সোনালী অক্ষরে!
গোলের পরই ধারাভাষ্যকার বলেই উঠলেন, ‘পুরো স্টেডিয়াম যেন কাঁপছে!" দক্ষিণ আফ্রিকা দল প্রথম গোল হজম করার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই আবারও তাদের গোলকিপার রনউইন উইলিয়ামসকে পড়তে হলো পরীক্ষার মুখে, দুর্দান্ত এক সেভ করে আবারও দলকে রক্ষা করলেন তিনি! মেক্সিকান ফুটবলাররা যেন এখন দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগকে নাচিয়ে বেড়াচ্ছিল।
এরপর ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখল এবারের ফিফা বিশ্বকাপ। মেক্সিকোর ৯ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড়কে বাজেভাবে ট্যাকল করে কার্ডটি দেখলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তেবোহো মোকোয়েনা। এর কিছুক্ষণ পরই গোলদাতা কুইনোনেস বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার গোলপোস্ট লক্ষ্য করে দারুণ এক শট নিলেন, কিন্তু বল ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে চলে গেল।
ম্যাচের শুরুতে ঝোড়ো গতির লড়াইয়ের পর এখন কিছুটা ধীরস্থিরভাবে খেলছে দুই দলই। মেক্সিকো সিটির উচ্চতাজনিত কারণে খেলোয়াড়রা যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। ৪২ মিনিটে অবিশ্বাস্য এক সেভ! বক্সের ভেতর দারুণ এক চিপ পাস এসেছিল। মেক্সিকোর ফরোয়ার্ড হিমেনেজ অফসাইড ফাঁদ ভেঙে পা বাড়িয়ে ভলি করেছিলেন গোলপোস্ট লক্ষ্য করে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক উইলিয়ামস যেন আজ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন—পুরো শরীর প্রসারিত করে আবারও দারুণ দক্ষতায় রুখে দিলেন মেক্সিকান এই স্ট্রাইকারকে!
প্রথমার্ধের বাকি সময়টা যেন মেক্সিকোরই ছিল। আল-কাদসিয়ার উইঙ্গার কুইনোনাস আরও দুটি দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন, যার একটি বিরতির ঠিক আগে গোলপোস্টের কোণায় লেগে ফিরে আসে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা শুরুতে ছন্দ খুঁজে পেতে হিমশিম খেলেও, প্রথমার্ধের শেষ দিকে এমবোকাজির একটি অন-টার্গেট শট জানিয়ে দিয়েছে—তারাও লড়াইয়ে ফিরতে মরিয়া।