বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্পের আগ্রাসী লক্ষ্যে ঝুঁকিতে ন্যাটো

চাথাম হাউসের প্রতিবেদন
ট্রাম্পের আগ্রাসী লক্ষ্যে ঝুঁকিতে ন্যাটো

ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন ও উদ্বেগজনক সুর শোনা যাচ্ছে। সাবেক ও বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তারা, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আবার মহান করুন’ আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা, এমনকি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিচ্ছেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এ বক্তব্য ডেনমার্কে প্রবল আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রের অংশ।

কেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীন আর্কটিক অঞ্চলে তাদের সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। যদি রাশিয়া কখনও যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাহলে সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পথ গ্রিনল্যান্ডের আকাশসীমা দিয়েই যেতে পারে। এই কারণেই গ্রিনল্যান্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে যুক্তরাষ্ট্র আগাম সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন প্রয়োজন

এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড়। কারণ বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যেই শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেস ১৯৪৩ সাল থেকে মার্কিন সামরিক ব্যবহারে রয়েছে। এটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা পরিচালিত হয় এবং বৈশ্বিক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

১৯৫১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি ব্যবহার করছে। এই চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে—ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব চ্যালেঞ্জ না করেই।

শীতল যুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ডে একসময় প্রায় ৬,০০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করত। তাই আজও চাইলে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই সেখানে সেনা সংখ্যা বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ড দখল করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই।

আগ্রাসী লক্ষ্য থেকে পিছুপা হচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রাসী লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটছে না। তারা বিষয়েটি নিয়ে প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপও নাকোচ করছে না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে ডেনমার্ক যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও। তিনি ডেনিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। ডয়েচ ভেলে বলছে, মূলত এ বিষয় নিয়ে আলোচনা তোলাই ন্যাটোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া ও ন্যাটোর সংকট

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হুমকি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয়ই ন্যাটোর সদস্য এবং গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার আগে থেকেই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডে হামলা মানে ন্যাটোর অবসান।’ এটি কোনো অতিরঞ্জন নয়। কারণ একটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র যদি আরেকটি ন্যাটো সদস্যের ভূখণ্ড দখল করতে যায়, তাহলে সেই জোট আর টিকে থাকার নৈতিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি হারাবে।

ন্যাটোর মূল ভিত্তি হলো— একজন সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা (আর্টিকেল ৫)। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যদি এই নীতিকে ভেঙে ফেলে, তাহলে ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন

ন্যাটো নিজেকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে দাবি করে। এই যুক্তিতেই ন্যাটো রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের সমালোচনা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেই আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালায় বা গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেয়, তাহলে ন্যাটোর সেই নৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর করণীয় কী

ইউরোপের অনেক দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে দ্বিধা করছে। ফ্রান্স ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলাকে বেআইনি বলে নিন্দা করলেও যুক্তরাজ্যের মতো দেশ তুলনামূলক নরম ভাষা ব্যবহার করেছে। কিন্তু বিশ্লেষদের মতে, এই দ্বিধা ভবিষ্যতে ইউরোপের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ আজ যারা নীরব থাকবে, আগামী দিনে তারাই আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে না। ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন থেকেই ভাবতে হবে— যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ন্যাটো কেমন হবে? কোন কোন সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি এবং সেগুলো কীভাবে নিজেরা গড়ে তোলা যায়?

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপের বাস্তব চাপ

অনেকে মনে করেন ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অসহায়। বাস্তবে তা নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য ও আর্কটিক অঞ্চলে তাদের অভিযান পরিচালনা করে।

ইউরোপ চাইলে— মার্কিন যুদ্ধজাহাজে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করতে পারে, মার্কিন সেনাদের চিকিৎসা সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে, ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটির জন্য উচ্চ ভাড়া দাবি করতে পারে, এমনকি কিছু সামরিক স্থাপনা বন্ধ করার প্রস্তাবও দিতে পারে।

এসব আগে কল্পনাতীত ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এগুলোই যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে পারে যে ইউরোপ কোনো ‘ফ্রি রাইডার’ নয়, বরং এই সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক লাভজনক।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি শুধু ডেনমার্ক নয়, পুরো ন্যাটো জোটের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন একটি ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা চাইলে নীরব থাকতে পারে, অথবা আন্তর্জাতিক আইন ও নিজেদের নিরাপত্তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে। এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে— ভবিষ্যতের ইউরোপ নিরাপদ হবে না কি আরও অনিশ্চিত।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হামিদ রায়হানের কবিতা : মাটির পতাকার গাঁথা

ঢাবিতে ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়

তিন ঘণ্টা ওঝার ঝাড়ফুঁক, শেষ পর্যন্ত প্রাণ গেল কৃষকের

তিন নতুন জিরো : ইউনূস সরকারের তিক্ত প্রাপ্তি

ফেসবুকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি বিধান নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আইসিএবির উদ্যোগে ‘উইমেন ইন লিডারশিপ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স কনফারেন্স ২০২৬’

স্লোগান লেখা নিয়ে উত্তেজনা, কারাগারে ছাত্রলীগ নেতা

নাহিদ রানার ভয়ে কাঁপছে অস্ট্রেলিয়াও

এআইইউবিতে নোবেলজয়ী ড. অ্যান ল’হুইলিয়ারের ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত

দ্বিতীয় ধাপে ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করবে এনসিপি

১০

রাজশাহীর আম যাচ্ছে ফ্রান্সে

১১

আরেক প্রশাসকের বিদেশযাত্রার আবেদন বাদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

১২

নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার

১৩

২ কোটি টাকা নিয়ে নারী হকির পাশে ব্র্যাক ব্যাংক

১৪

সিআইডি পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, যুবক গ্রেপ্তার

১৫

হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ইরানের ওপর ইইউ’র নতুন নিষেধাজ্ঞা

১৬

নারী ফুটবলারদের পাশে আমিনুল হক

১৭

কর্ণফুলীতে ভেসে উঠল মরদেহ

১৮

ট্রাম্পের অনুরোধে ইরানে হামলা স্থগিত করেছে ইসরায়েল!

১৯

টেস্ট দলে কি জায়গা হারাচ্ছেন শাহীন আফ্রিদি?

২০
X