ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা যত এগোচ্ছে, তর্কবিতর্কে ততটাই সরগরম হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস। একদিকে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উঠছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, অন্যদিকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সব মিলিয়ে নির্বাচনী আমেজ-উত্তেজনা ছড়িয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
এদিকে প্রচারকালে নির্বাচনে জয়ী হলে প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের জন্য কী কী করবেন—এমন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুড়ছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় ও কুশল বিনিময়ের পর ভোট চাইতে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট দূর করার পাশাপাশি গণরুম ও গেস্টরুম কালচার বন্ধ, বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা, চিকিৎসা ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি বন্ধসহ দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। এক প্যানেল অন্য প্যানেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও সামনে আনছে। সবমিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে সরগরম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
গত ২৬ আগস্ট থেকে ক্যাম্পাসে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা। গতকাল শনিবার প্রচারের পঞ্চম দিন পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণায় প্রাণবন্ত ছিল ক্যাম্পাস। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীরা প্রচার চালাতে পারবেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রচারের সুযোগ থাকবে। তবে ছাত্রীদের হলগুলোতে আজ রোববার থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা প্রচারের সুযোগ থাকবে। অবশ্য প্রচারের ক্ষেত্রে আচরণবিধি কড়াভাবে মানার নির্দেশনা থাকলেও তা প্রতিপালন হচ্ছে না অনেকটাই।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, লিফলেট বিতরণসহ প্রার্থীরা নানা ধরনের কর্মসূচি চালাচ্ছেন। প্রার্থীরা প্রতিদিনই হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন, প্রার্থীরাও নির্বাচিত হলে নানা প্রতিশ্রুতি পূরণ করার কথা বলছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপগুলোতেও এখন ডাকসু নির্বাচনের আমেজ। প্রার্থীদের তৈরি করা প্রচারমূলক নানা ভিডিও ক্লিপ ঘুরছে গ্রুপগুলোতে। আবার প্রার্থীদের নিয়ে ভোটাররাও করছেন আলোচনা-সমালোচনা। অনলাইনে তর্কে-বিতর্কে জড়াচ্ছেন অনেকেই। এ ছাড়া একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের আয়োজনে ক্যাম্পাসে ‘ডাকসু: দ্য স্টুডেন্ট ভয়েজ’ শীর্ষক টকশো দিয়েছে ভিন্ন আমেজ, ছড়িয়েছে উত্তাপ। প্রার্থীরা একে অপরকে কাবু করার প্রতিযোগিতার মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন এ অনুষ্ঠানকে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের এ ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভিন্ন ধরনের উদ্দীপনা। বহু প্রতীক্ষিত এ নির্বাচন ঘিরে তারা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি আমেজ ও আগ্রহ অনুভব করছেন। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ জানান, তারা প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছেন এবং প্রার্থীদের প্রচার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট প্যানেলের প্রতি পক্ষপাত না দেখিয়ে যোগ্য ও দক্ষ প্রার্থীকেই তারা প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী খালেদ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ক্যাম্পাসে ভিন্ন এক আমেজ তৈরি করেছে। আমরাও আমাদের যোগ্য প্রতিনিধির খোঁজে আছি। কোনো নির্দিষ্ট প্যানেল দেখে ভোট দেব না। সবাইকে কাছ থেকে দেখছি, শুনছি, পর্যবেক্ষণ করছি। যোগ্যতা, দক্ষতা আর প্রস্তাবিত পরিকল্পনাই হবে আমাদের কাছে আসল বিবেচ্য বিষয়। সত্যিকারের প্রতিনিধি হিসেবে যিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন, তাকেই আমরা বেছে নিতে চাই।’
২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচন যারা পেয়েছেন, তারা এ দুই নির্বাচনের মাঝে অনেকটা তফাত খুঁজে পাচ্ছেন। এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা ও সহাবস্থান আগে দেখেননি। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফজলুর রহমান বলেন, ‘২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভোট দিয়েছি ঠিকই, তবে এমন পরিবেশ ছিল না। ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতো। প্রশাসনও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেননি। হলগুলোতে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কেউ প্রার্থিতা দিতে চাইলে তাকে বাধ্য করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অনেককে মারধর করেছে। তবে এবারের নির্বাচনের পরিবেশ ভিন্ন। তর্কবিতর্ক হচ্ছে; কিন্তু এখনো পর্যন্ত সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে।’
ছাত্রদলের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান কালবেলাকে বলেন, ‘২০১৯ সালের নির্বাচনেও আমি প্রার্থী ছিলাম। কিন্তু নিজের ভোটটাও নিজে দিতে পারিনি। কোনো ধরনের সহাবস্থান ছিল না। আশা করি, এবার আমরা সুন্দর একটি নির্বাচন দেখতে পাব।’
এদিকে, শুরু থেকেই প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরুর আগেই অনেক প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে তাদের রঙিন পোস্টার লাগান। কিন্তু নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী কোনো প্রার্থী নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোনো ধরনের রঙিন পোস্টার লাগাতে বা প্রচারণা চালাতে পারবেন না। প্রার্থীদের পোস্টার সাদা-কালো হতে হবে এবং তা শুধু ভোটারদের হাতেই বিলি করা যাবে। ডাকসু ও হল সংসদ আচরণবিধির ২(ক)নং অনুচ্ছেদের ‘মনোনয়নপত্র দাখিল ও প্রত্যাহার’ পয়েন্টে বলা হয়েছে—মনোনয়নপত্র সংগ্রহ এবং দাখিলের সময় কোনো ধরনের মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না। এ ছাড়া আচরণবিধির বেশিরভাগ অংশজুড়ে স্লোগান দিয়ে মিছিল না করার কথা বলা আছে। সেটিও কয়েকজন প্রার্থীকে মানতে দেখা যায়নি।
অথচ আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’-এর ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা ওই ব্যানারে থাকা প্রার্থীদের ছবি বিকৃত করে, পুরুষ প্রার্থীদের মাথায় শিং এবং হিজাব পরিহিত নারী প্রার্থীদের ছবিতে অঙ্কন করে বিকৃতি ঘটায়। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী বা কোনো ভোটার অন্য কোনো প্রার্থীর ব্যানার/লিফলেট/ফেস্টুন/হ্যান্ডবিলের ক্ষতি করতে পারবেন না। ওই ঘটনায় এই আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে।
আচরণবিধি অনুযায়ী প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোনো উপঢৌকন বিলি-বন্টন, আপ্যায়ন ও অর্থ সহযোগিতা করতে পারবেন না। এ ধরনের কার্যক্রম আচরণবিধি লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। যদিও এই আচরণবিধি লঙ্ঘন করে গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের দোকানে ১৩২ শিক্ষার্থীকে রাতের খাবার খাওয়ানোর অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক পদপ্রার্থী স্বাধীন আহমেদের বিরুদ্ধে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন প্যানেলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপের প্রোপাগান্ডার (অপপ্রচার) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় কোনো কোনো প্রার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নির্বাচনের প্রচারে প্যানেলগুলোর মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা চলছে বলে মনে করেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদ’ প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘সব প্যানেলের প্রার্থীদের মধ্যে যেন আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিযোগিতা চলছে। অথচ প্রশাসন নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। আচরণবিধি ঘোষণার পর কেউ মানছে না। বরং প্রশাসন একটি পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।’
ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম বলেন, ‘কোনো একটা ছাত্র সংগঠনকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া এবং এর মাধ্যমে ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যাওয়া—কোনোটাই কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল কাজ, অর্থাৎ জ্ঞান উৎপাদন, বিতরণ বা জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, সেই কাজটা কিন্তু আমরা করতে পারিনি।’
ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ‘প্রার্থীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে অনলাইনে ভুয়া তথ্য দিয়ে নানা ধরনের অপচেষ্টা চলছে। আমাদের দুজন প্রার্থীর একজনের আইডি হ্যাক করা হয়েছে, আর আরেকজনের আইডি হ্যাক করার চেষ্টা চালানো হয়। আমরা বারবার বলার পরও প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।’
আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন কমিশন। কমিটি গঠন করার পরও নির্বাচন কমিশন ও আচরণবিধি সংক্রান্ত এই টাস্কফোর্স কমিটিকে উল্লেখযোগ্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি। শুধু বিনা অনুমতিতে টিএসসিতে গান, কবিতাসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহার উপস্থাপন করা ডাকসু নির্বাচনের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদপ্রার্থী মো. মাহাবুব খালাসীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে টাস্কফোর্স কমিটির অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রাথমিকভাবে আমরা সতর্ক করছি। এ বিষয়ে আমরা আরও কঠোর হব। আশা করি, সব প্রার্থীই নির্বাচনে আচরণবিধি মেনেই প্রচার-প্রচারণায় অংশ নেবে।’
মন্তব্য করুন