

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সংকটময় বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসক। খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন। মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকের মাধ্যমে সিসিইউতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসনকে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বসেছিল মেডিকেল বোর্ড। এদিন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীসরহ জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা তাকে দেখতে গিয়েছিলেন।
এদিকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য দেশবাসীর দোয়া কামনা করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা ও সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার নির্দেশ প্রদান করেন। এমন সৌজন্য ও মানবিক অনুভূতি প্রকাশের জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল রাতে ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ বার্তা দেন তিনি।
অন্যদিকে, দলীয় প্রধানের দ্রুত আরোগ্য কামনায় গতকাল বাদ জুমা রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী দোয়া মাহফিল কর্মসূচি পালন করে বিএনপি।
এ ছাড়া সংকটাপন্ন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে রাতে হাসপাতালের সামনে ভিড় করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। রাত সোয়া ১১টার দিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান। এ ছাড়া বিএনপির আরও জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার গাড়ি আসতে সেখানে দেখা গেছে।
খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার গতকাল কালবেলাকে বলেন, ‘ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) সিসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’ সবাইকে দোয়া করারও আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল বাদ জুমা রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন বেগম খালেদা জিয়া আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং গতকাল রাতে (বৃহস্পতিবার) ডাক্তাররা বলেছেন যে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়। সেজন্য আমরা দলের পক্ষ থেকে গণতন্ত্রের নেত্রী, গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য সারা দেশের জনগণের কাছে জুমার নামাজের পর মসজিদে মসজিদে দোয়া চেয়েছিলাম এবং সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজকে (গতকাল) নয়াপল্টনের মসজিদে নামাজ আদায় করে আমরা সবাই আমাদের নেত্রীর রোগমুক্তির জন্য পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া চেয়েছি।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা দোয়া চেয়েছি আল্লাহ তায়ালার কাছে, তিনি যেন ম্যাডামকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেন, সুস্থ অবস্থায় আবার জনগণের মাঝে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ করে দেন। আমরা আবারও দেশের মানুষের কাছে তার রোগমুক্তির জন্য দোয়া করার আহ্বান জানাচ্ছি। সবাই ম্যাডামের জন্য দোয়া করবেন।’
খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম এবং কারাভোগ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল।
এর আগে গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) দ্বিবার্ষিক সম্মেলনেও বিএনপি মহাসচিব দলের চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে আছেন। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাতে আমি প্রায় ২টার সময় ফিরেছি হাসপাতাল থেকে। তখনো ডাক্তাররা চেষ্টা করছিলেন, কাজ করছিলেন। আমি অনুরোধ করব, আপনারা আশু রোগমুক্তির জন্য দোয়া করবেন, দেশবাসীকে দোয়া করার আহ্বান জানাচ্ছি আপনাদের মাধ্যমে।’
খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি ও সুস্থতা কামনায় রাজধানীসহ সারা দেশে মসজিদে মসজিদে গতকাল বাদ জুমা দোয়া মাহফিল হয়েছে বলে জানান বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গতকাল বিকেলে মুন্সীগঞ্জের সরকারি লৌহজং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা বাস্তবায়ন এবং খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় গণদোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ। একই দিনে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপুর উদ্যোগে বাদ জুমা খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি ও দীর্ঘায়ু কামনায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার মধুপুর মাদ্রাসায় বিশেষ দোয়া হয়।
গত ২৩ নভেম্বর রাতে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন খালেদা জিয়া। পরে রাতেই মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ফুসফুসে (চেষ্টে) ইনফেকশন হয়েছে। কেবিনে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে উনার চিকিৎসা চলছে।’
দোয়া কামনা প্রধান উপদেষ্টার: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিয়মিত খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রস্তুত।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের এ সময়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা। তার সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রতি তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা: খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সৌজন্যতায় তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল রাতে তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। ফেসবুকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লেখেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানী’র এভারকেয়ার হাসপাতালে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশবাসীর নিকট তার আশু সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করেছেন।’
তারেক রহমান লেখেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন এবং তার সুচিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব সহায়তা ও সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা, তার সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রধান উপদেষ্টার সৌজন্যতায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দেশনেত্রীকে নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিবৃতিতে যে সৌজন্য ও মানবিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে সেজন্য প্রধান উপদেষ্টাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’