

নিকোলাস মাদুরোর অপসারণ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর ভেনেজুয়েলায় গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন দেলসি রদ্রিগেজ। যদিও তার নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং প্রধান সড়ক ও শহরে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
রাজধানী করাকাসসহ বড় শহরগুলোতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে রেশনিংয়ের আওতায় থাকা জনগণ এবার আরও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দোকানপাট বন্ধ, বাজারে জিনিসপত্রের সংকট, জ্বালানির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। দেশের বহু হাসপাতাল এখন জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে, যার জ্বালানিও সীমিত।
এ সংকটের মধ্যে জনজীবনে ভয়ের ছায়া নেমে এসেছে। অনিশ্চয়তা আর গুজবের কারণে বহু মানুষ দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। প্রতিবেশী কলম্বিয়া ও ব্রাজিল সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহ বেড়েছে। অনেক পরিবার সীমান্তে আটকা পড়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো চেষ্টা করছে কিছু সহায়তা দিতে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিণতিতে দেশের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারপন্থি ও বিরোধী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে নিয়মিত। সেনাবাহিনী ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। কিছু এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই নানা সহিংস ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বাহিনী। বিশেষ করে জুলিয়া ও ওরিনোকো অঞ্চলের বেশকিছু তেলক্ষেত্র এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্থানীয় শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কর্মবিরতি পালন করছে। তারা এ হস্তক্ষেপকে ‘বিদেশি দখল’ বলে মনে করছে এবং নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এতে তেল উৎপাদন কার্যত থমকে গেছে। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশটি আরও গভীর মন্দার মুখে পড়েছে।
বর্তমানে দেশজুড়ে সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা বাসায় অবস্থান করছে; কিন্তু পড়ালেখার কোনো সুযোগ নেই। এ শিক্ষা স্থবিরতা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। একই সঙ্গে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত বা আংশিকভাবে বন্ধ থাকায় মানুষের মধ্যে তথ্যপ্রবাহে ছেদ পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়েছে, যা জনমনে আরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
গণমাধ্যমগুলো কার্যত স্তব্ধ। জাতীয় টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সরকারি ঘোষণাগুলো ছাড়া অন্য কোনো সংবাদ প্রচারের সুযোগ নেই। জনগণ প্রকৃত তথ্য বঞ্চিত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও, দেশীয় বাস্তবতা বিশ্ববাসীর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলছেন, তিনি আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে যেভাবে চাপ আসছে, তা তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে বলেও মন্তব্য করেছেন। তার প্রশাসনের অনিশ্চিত অবস্থান আরও দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত রদ্রিগেজকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, বরং বলছে তিনি যদি ‘সঠিক কাজ’ না করেন, তাহলে তার পরিণতি মাদুরোর চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে।
এ বক্তব্য দেশজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, রাজনৈতিক আলোচনার সুযোগ না দিয়ে যদি আবারও বাইরের হস্তক্ষেপ ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। অনেকেই বলছেন, এ অবস্থায় আলোচনার পথই হতে পারে সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র সম্ভাব্য পথ।
ভেনেজুয়েলার এ অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন শুধু একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে। দেশটির জনগণ আজ যুদ্ধ, দখল ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে এক ধরনের শূন্যতায় বাস করছে, যেখানে প্রতিদিন এক নতুন আতঙ্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মন্তব্য করুন