আবুল হাসনাত, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

গ্যাস যেন সোনার হরিণ, এলপিজি সংকটে নাভিশ্বাস

এলপিজি সিলিন্ডার। ছবি : কালবেলা
এলপিজি সিলিন্ডার। ছবি : কালবেলা

চট্টগ্রামে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে রান্নার গ্যাস। নগরের বহু বাসাবাড়িতে নিভে গেছে চুলা, হোটেল–রেস্তোরাঁয় রান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম, আর সাধারণ মানুষের মুখে একটাই অভিযোগ সিলিন্ডার গ্যাস এখন যেন সোনার হরিণ, খুঁজলেই মিলছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী গ্যাস মজুত রেখে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া, কর্ণফুলি, পতেঙ্গা, পাহাড়তলী, বায়েজিদ, হালিশহর, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট ও চকবাজারসহ যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ নেই, সেসব এলাকার মানুষ পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। শীত মৌসুমে রান্না, গরম পানি ও খাবার সংরক্ষণে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ে। ঠিক এই সময়েই বাজারে তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।

নগরের বিভিন্ন ফুটপাতের চা দোকান ও ছোট খাবার হোটেলে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে।

দোকানিরা বলছেন, গ্যাস না পেলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপছে।

এলপিজির ওপর নির্ভরশীল একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আগে সরকার নির্ধারিত দামে নিয়মিত সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও এখন তা মিলছে না। কোথাও থাকলেও ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। অনেকেই এটিকে পরিকল্পিত সংকট বলে মনে করছেন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে থাকে। সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্তের পরপরই বাজারে অস্থিরতা বাড়তে শুরু করে। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড অভিযোগ করেছে, পরিবেশকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই মূল্য নির্ধারণ করায় বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দেয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। তাদের দাবি, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৭টি কোম্পানির বাজারজাত করা সাড়ে পাঁচ কোটি সিলিন্ডারের বিপরীতে মাত্র এক কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল হচ্ছে। এতে করে মোট চাহিদার বড় একটি অংশ অপূরণীয় থেকে যাচ্ছে।

ব্যবসায়ী সংগঠনের অভিযোগ, এই অবস্থায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে। তাদের মতে, পরিবেশকদের বড় অংশ লোকসানে পড়েছেন এবং টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের নগরজীবনে। বিভিন্ন এলাকায় দোকান ঘুরেও অনেক ভোক্তা সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। কোথাও পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। বাকলিয়া এলাকার কয়েকটি দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, সিলিন্ডার রাখার জায়গা প্রায় ফাঁকা। দোকানিরা বলছেন, ডিস্ট্রিবিউটররা গ্যাস দিচ্ছেন না। আবার ডিস্ট্রিবিউটরদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।

তবে ভোক্তাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের মতে, এই ‘কম সরবরাহ’ আসলে কৃত্রিম। অনেক ডিলার গ্যাস গুদামে রেখে দাম বাড়ার অপেক্ষা করছেন। বায়েজিদ এলাকার গৃহিণী নাসরিন আক্তার জানান, তিন দিন ধরে তার বাসায় রান্না হয়নি। দোকানে গেলেই বলা হচ্ছে গ্যাস নেই। এক জায়গায় পাওয়া গেলেও ১ হাজার ৮০০ টাকার নিচে দিতে চায়নি।

কর্ণফুলি উপজেলার রিকশাচালক আবদুল মালেক বলেন, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের পক্ষে এত টাকা দিয়ে গ্যাস কেনা অসম্ভব। গ্যাস না পেলে তার পরিবারের রান্নাই বন্ধ হয়ে যায়।

নগরের হোটেল–রেস্তোরাঁ খাতেও চাপ বেড়েছে। এক হোটেল মালিক জানান, আগে ১ হাজার ২৫০ টাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যেত। এখন তা পাওয়া যায় না, আর পেলেও ১ হাজার ৮০০ টাকা চাওয়া হয়। এই অবস্থায় খাবারের দাম না বাড়ালে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়।

ভোক্তাদের বড় একটি অংশ মনে করছে, দেশে এলপিজির প্রকৃত ঘাটতি নেই। আমদানিকারক, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ যোগসাজশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। চকবাজার এলাকার এক খুচরা ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডিস্ট্রিবিউটররা অনেক সময় সরাসরি দোকানে গ্যাস না দিয়ে অন্যত্র বেশি দামে সরবরাহ করছেন।

এলপিজির দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ পেলে তারা অভিযান চালান। সব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এসব অভিযান অনেক সময় লোক দেখানোতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

চট্টগ্রাম নগরে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সীমিত হওয়ায় এলপিজি-ই অধিকাংশ পরিবারের একমাত্র ভরসা। সেই গ্যাসই যখন অধরা হয়ে ওঠে, তখন নগরবাসীর জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাশেদ মাহমুদ বলেন, বেতন বাড়েনি, অথচ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি গ্যাসের দামও লাগামছাড়া হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারও পদক্ষেপ নিয়েছে। সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ থাকার মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার এলপি গ্যাস আমদানিতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং স্থানীয় পর্যায়ের উৎপাদনে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম কমানো এবং বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, শুল্ক পুনর্বিন্যাস কার্যকর হলে ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, সরকারি এই সিদ্ধান্তের সুফল এখনো বাজারে পৌঁছায়নি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ থাকায় ভোক্তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই— যেখানে দেশে এলপিজি আমদানি হচ্ছে এবং গুদামে মজুত রয়েছে, সেখানে বাজারে গ্যাস উধাও কেন? কার স্বার্থে এই সংকট, আর কবে মিলবে স্বস্তি?

যতদিন পর্যন্ত বাজারে স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত না হবে, ততদিন চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে চুলার আগুনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বলতে থাকবে ক্ষোভও।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

আকিজ বশির কেবলস্-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু

শনিবার যেসব জেলায় দীর্ঘ সময় থাকবে না বিদ্যুৎ

মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের নতুন সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে

সফলতার নেপথ্যে : উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের ১০টি মূলমন্ত্র

তামিমকে লক্ষ্য করে বিসিবির সেই পরিচালকের নতুন পোস্ট

ভেনেজুয়েলায় তেল ছাড়াও রয়েছে বিপুল স্বর্ণ ও খনিজ ভাণ্ডার

ভিন্নরূপে শহিদ কাপুর

জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তারেক রহমান

নওগাঁয় প্রশ্নফাঁস চক্রের দুই সদস্যসহ আটক ৯

১০

সম্পর্কে ইতি টানলেন খুশি-বেদাঙ্গ

১১

সুখবর পেলেন বিএনপির ১২ নেতা

১২

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, কুড়িগ্রামে ডিভাইসসহ আটক ১০

১৩

বিএনপি-জামায়াত কি জাতীয় সরকার গঠন করবে?

১৪

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির সঙ্গে খলিলুর রহমানের বৈঠক

১৫

ঢাকায় তুরস্কের ভিসা আবেদন গ্রহণের সময়সূচি ঘোষণা

১৬

মুগ্ধতায় শায়না আমিন

১৭

নির্বাচনের আগে পে স্কেল দেওয়া সম্ভব কি না, জানালেন গভর্নর

১৮

এবার মাদুরোকে নিয়ে মুখ খুললেন এরদোয়ান

১৯

টাঙ্গাইলের ৩ কিলোমিটার এলাকায় যান চলাচল পরিহারের অনুরোধ

২০
X