

বিএনপি আগামীতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে বলেই মনে করছেন অনেকে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সংস্থার একাধিক জরিপেও এমন আভাস মিলেছে। বিএনপির হাইকমান্ডও এ বিষয়ে ইতিবাচক। এমন প্রেক্ষাপটে বিদেশি কূটনীতিকরাও বিএনপিকে নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে। এরই অংশ হিসেবে গত তিন দিনে অন্তত ৮টি গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধি এবং কূটনীতিকরা তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), অস্ট্রেলিয়া, চীন, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিশর, ভারত ও জার্মানির মতো দেশ রয়েছে। এসব দেশের কূটনীতিক ও বিএনপির চেয়ারম্যানের মধ্যকার বৈঠকে উভয় দেশের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কর্মপরিকল্পনা কী হবে, তা কূটনীতিকদের জানাচ্ছে বিএনপি। কূটনীতিকরাও ইতিবাচকভাবে তাদের মতামত দিচ্ছেন। দলটির সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রতি বিদেশি রাষ্ট্রের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিএনপিকে আগামী দিনের একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সারা বিশ্বের কূটনীতিকরা শোক প্রকাশ করেছেন। তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে এ বিশাল ক্ষতি সামলে নিয়ে যেভাবে দল ও রাজনীতিতে নিজেকে সক্রিয় রেখেছেন, তা বিদেশি দূতদের কাছে তার ‘নেতৃত্বের পরিপক্বতা’ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আগ্রহ ও আলোচনার কেন্দ্রে তারেক রহমান: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন তারেক রহমান। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারান তিনি। একদিকে মা হারানোর শোক, আরেকদিকে ভঙ্গুর রাষ্ট্র ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন; এই দুই কঠিন চ্যালেঞ্জ এখন তারেক রহমানের সামনে। তবে শোক কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে সবকিছু সামলে নিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে দল পরিচালনা, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের গুরুদায়িত্বে এখন তার পূর্ণ মনোযোগ। গত কয়েকদিনে ঢাকার গুলশানে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দেখা গেছে কূটনৈতিক তৎপরতার এক অভূতপূর্ব কর্মব্যস্ততা। মায়ের মৃত্যুতে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ব্যক্তি এবং কূটনীতিকরা শোক জানিয়েছেন তারেক রহমানকে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, তারা একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন, যেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে। গড়া হবে ‘রেইনবো নেশন’ (রংধনু জাতি)। তারেক রহমান কূটনীতিকদের জানিয়েছেন, বিএনপি শুধু ক্ষমতা বদল নয়, বরং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে মানুষের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র তারা বিনির্মাণ করতে চান।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালবেলাকে বলেন, ‘শুধু বিদেশি কূটনীতিকরা নন, সমগ্র দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে এখন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কারণ বহু বছর পর একটা বেশ কঠিন সময়ে আমাদের নেতা তারেক রহমান বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন। সমগ্র দেশের মানুষ এক বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি এরই মধ্যে দূরে (বিদেশে) থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে যে কথাগুলো জাতির সামনে বলেছেন, গোটা জাতি এতে আজ অনেক বেশি আশান্বিত হয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, এবার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে সত্যিকার অর্থেই একটা উদারপন্থি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা এখানে সৃষ্টি করতে পারব।’
আগামীর বাংলাদেশ ও বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন কালবেলাকে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শূন্যতা পূরণ করা সহজ নয়। তবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার কূটনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে প্রমাণ করছেন, বিএনপি এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে সুসংগঠিত। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এই ধারাবাহিক বৈঠক শুধু নির্বাচনী রাজনীতির অংশ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি তৈরির একটি প্রচেষ্টা। সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে বিএনপি যে আগামীর পথে হাঁটছে, তার ফল আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে ইনশাআল্লাহ।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ট্রানজিশনাল সময় পার করছে। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই নির্বাচনের মাধ্যমে কারা সরকার গঠন করবেন। তবে বিদেশি কূটনীতিকরা এরই মধ্যে বিএনপি ও দলটির নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভূমিকা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন। তারা মনে করছেন, তারেক রহমানই পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ ও জনগণের নেতৃত্ব দেবেন।’
তিন দিনে ৮ দেশের কূটনীতিকদের বৈঠক: এরই মধ্যে তারেক রহমান ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকগুলোতে বিএনপির পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে আগামীর ‘রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা’ এবং বৈশ্বিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। গত তিন দিনে অন্তত ৮টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও শীর্ষ কূটনীতিকরা তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথকভাবে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে গত ৭ জানুয়ারি বিকেলে গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে এটি চীনা রাষ্ট্রদূতের প্রথম সাক্ষাৎ।
এর পর গত ৯ জানুয়ারি পরপর তিনটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সেদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রথমে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার। সেদিনই সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ এবং অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার সুসান রাইল তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎ করেন। এরপর ১০ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবস, বিকেল ৫টায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা, সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন এবং সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকায় মিশরের রাষ্ট্রদূত ওমর ফাহমি পৃথকভাবে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির কালবেলাকে বলেন, ‘মূলত বৈঠকগুলো ছিল কুশল বিনিময়ের এবং সৌজন্যমূলক। তাছাড়া কীভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার প্রথমে কূটনীতিকরা ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) জন্য কন্ডলেন্স (শোক) জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে। এরপর উভয় দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। আগামীতে বিএনপি সরকার গঠন করলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেসব বিষয়ে মূলত আলোচনা হয়েছে।’
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. রাশেদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা বেশ আগ্রহভরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে বৈঠক হচ্ছে। চীনসহ যেসব দেশের প্রতিনিধিরা এরই মধ্যে বৈঠক করেছেন, তারা বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী দেশ। বাণিজ্যিক সুসম্পর্কও রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশ এবং বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও দেশ গড়ার পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করতে চায় সেগুলো নিয়ে মতবিনিময় হচ্ছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাংলাদেশকে আরও কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সেসব বিষয়ও আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।’
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক বইয়ে ৪৮টি দেশের স্বাক্ষর: খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলটির গুলশানের কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়। শোক বইয়ে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা মিলিয়ে ৭২ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৮টি দেশ খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। ওই দিনই গুলশান কার্যালয়ে শোকবই খোলার পর রাজনৈতিক নেতারা, কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ তাতে লিখিত শোক জানিয়েছেন। এর মধ্যে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের হাইকমিশনার এবং চীনের রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগতভাবে গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে শোকবইয়ে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। এখনো অনেকে শোক বইয়ে স্মৃতিচারণা করতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে আসছেন। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, গণতন্ত্রের পক্ষে তার অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তার ভূমিকার কথা স্মরণ করে অনেকেই আবেগঘন স্মৃতিচারণা করে যাচ্ছেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বের প্রায় সব দেশের কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘের অধীনে সব সংস্থার প্রতিনিধি শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেছেন। তার মধ্যে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা শোক জানিয়েছেন এবং তাদের প্রতিনিধিরা গত ৩১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপতি এবং সরকারও শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে খোলা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন সংশ্লিষ্ট দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, প্রতিনিধি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
মন্তব্য করুন