রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মো. হুমায়ূন কবীর
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার নিয়ে উত্তেজনা ঘরে-বাইরে

১১ দলীয় জোটের কর্মসূচি ঘোষণা
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নানান ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে চলছে বাগযুদ্ধ। এরই মধ্যে প্রথম অধিবেশনে সাত দিনের মধ্যে দুই দফা ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। অধিবেশনের প্রথম দিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় হট্টগোল এবং ওয়াকআউট করেন বিরোধী দল ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যরা। এরপর বুধবার জুলাই জাতীয় সনদের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান ইস্যুতেও ওয়াকআউট করেন তারা। বর্তমানে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার ইস্যুতে সংসদ এবং সংসদের বাইরে উত্তেজনা চলছে। সরকারি দল চায় জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে। আর বিরোধী দল চায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার। দুই ইস্যুতে দুই দল নিজেদের অবস্থানে অনড়। এরই মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আগামীকাল শনিবার গণভোটের রায় কার্যকর এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করার ঘোষণাও দিয়েছে। এই বাস্তবতায় সরকারি ও বিরোধী দলকে সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে আলোচনার জন্য সংসদে মুলতবি প্রস্তাব আনে সরকারি দল। প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য ৫ এপ্রিল দুই ঘণ্টা সময় ধার্য করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। প্রস্তাবটি গ্রহণ করার কথা জানিয়ে স্পিকার সংসদে বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তৈরি হলো এক বিরল নজির। দীর্ঘ ৫৩ বছরের পথচলায় এই প্রথমবারের মতো ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারি দলের কোনো সদস্যের আনা মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে।

তার আগেই ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়ে আলোচনার জন্য গত ২৯ মার্চ মুলতবি প্রস্তাব এনেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এটি নিয়ে গত মঙ্গলবার সংসদে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে প্রতিকার না পাওয়া এবং প্রস্তাবটি চাপা দিতে আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব আনার প্রতিবাদে বুধবার ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।

ওয়াকআউটের পর রাতে সংবাদ সম্মেলন করেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে, সংশোধনের জন্য নয়। কিন্তু সরকার জনগণের সেই চূড়ান্ত রায়কে বেমালুম অগ্রাহ্য করে অপমান করেছে।

সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করার কথা থাকলেও সরকার তা করেনি। বাধ্য হয়ে আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে নোটিশ দিই। শেষ পর্যন্ত গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলে আইনমন্ত্রী জনগণের সংস্কারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। আমরা তখনই বলেছি, সংস্কার আর সংশোধন এক জিনিস নয়। সরকার জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে প্রতারণা করছে। আমাদের ১১টি দলের জোট দ্রুতই একত্রে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে। জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে জোটের বৈঠক শেষে ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১১ দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে রাজপথের আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। শনিবার বিকেলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে ১১ দল।

এ সময় তিনি সংসদে সরকারি দলের মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন এবং জ্বালানি সংকট সমাধানে ব্যর্থতার সমালোচনা করেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আগামী ৭ এপ্রিল বৈঠক করে ১১ দল দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

উত্তেজনা পরিহার করতে বললেন বিশ্লেষকরা: সংসদের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালবেলাকে বলেন, এই বিতর্কটা অহেতুক। কারণ, গণভোটের বিষয়ে সবাই একমত ছিল। এটা বলাও হয়েছে, মানুষ যদি এটার পক্ষে সম্মতি দেয়, তাহলে সব দল এগুলো বাস্তবায়ন করবে। এজন্য জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংশোধন আদেশ জারি হলো এবং এই আদেশের অধীনে গণভোট হলো। গণভোটের মাধ্যমে আদেশটার ব্যাপারে মানুষ সম্মতি দিয়েছে। ৪৮টি বিষয়ের ব্যাপারে গণভোট হয়েছে। সেগুলোর পক্ষে জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। জনগণ হলো সার্বভৌমত্বের প্রতীক, রাষ্ট্রের মালিক। এখন এই বিতর্ক শুধু জটিলতা সৃষ্টি করছে। এই জটিলতা থেকে এটা যদি রাজপথে গড়ায়, তাহলে কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

তিনি বলেন, এত বছর পর একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে। সংসদে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব আছে। ইনক্লুসিভ একটা সংসদ হয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের কেউ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। এখন আমরা যদি এই ইনক্লুসিভ পরিস্থিতিতে বিভাজন সৃষ্টি করি, ঐক্যকে যদি ভণ্ডুল করে দিই, তাহলে এটা কারও জন্য কল্যাণ হবে না। আমি আশা করব, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেই রায় মাথা পেতে নিয়ে এটা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

সংসদ প্রাণবন্ত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ নয় জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রাণবন্ত মানে সবাই কথা বলল; সবাই কথা বলার সুযোগ পেল, ওটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সংসদ কার্যকর কি না; সংসদের মাধ্যমে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারছি কি না; আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি কি না, সেসব দেখতে হবে। জুলাই সনদের আদেশের ভিত্তিতে গণভোট হয়েছে এবং জনগণ সম্মতি দিয়েছে, আমার পরামর্শ হলো এগুলো বাস্তবায়ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, বিগত তিনটি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়নি বিধায় সংসদেও তার প্রভাব পড়েছিল। নির্বাচন যদি সুষ্ঠ না হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক না হয়; ওই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয়, সেটাও ভালো সংসদ হবে না। এই সংসদ একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে। এই সংসদের প্রতিনিধিরা সংসদকে আইন প্রণয়নের জায়গা থেকে কীভাবে কার্যকর করা যায়, সেই জায়গায় কাজ করবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদ আসলে আমরা অনেক সময় মনে করি একটা বিতর্ক সভার মতো। এটা কোনো বিতর্ক সভা নয়। এটা প্রধানত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে পারস্পরিকভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। আগের ভালোমন্দ দিকগুলোকে কেন্দ্র করে যদি হয়, সেটা ঠিক আছে। যদি একে অপরের মধ্যে কুৎসা রটনার জন্য বা পারস্পরিক অপমান করার জন্য হয়, সেটা সংসদের জন্য ভালো হবে না।

মাহবুবুর রহমান বলেন, বিরোধী দল রাস্তায় না নেমে সংসদেই সব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করাটা ছিল ভালো কাজ। কারণ, মানুষ অনেকদিন ধরে সংসদ পায়নি। রাজনৈতিক দলগুলোকে ঠিক কাজ করার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সংসদ তৈরি করে দিয়েছে। এখন যদি সংসদকে পাশ কাটিয়ে (বাইপাস) সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মতো রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চলে; মানুষের জীবনে যদি অস্থিরতা তৈরি হয়, এটা ভালো কিছু হবে না। এটা মানুষ আশা করে না। মানুষ চায় সরকার এবং বিরোধী দলের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে সংসদে সব সমস্যার সমাধান হোক।

সরকারি ও বিরোধী দলের পরামর্শ জানতে চাইলে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, মাত্র সংসদ গঠিত হয়েছে। সংসদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা আছে। সে প্রত্যাশাটা সংসদীয় পদ্ধতিতে সংসদে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক যে বিতর্ক আছে, সে বিতর্কটা শেষ করা। বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করা।

তিনি বলেন, এখন সরকার এবং বিরোধী দলের আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। এখন কেউ যদি মনে করে আমারটাই করতে হবে, তাহলে তো আর হবে না। কোনো বিষয়ে বিতর্ক হলে জুডিসিয়াল প্রসেসেও যেতে পারেন। সবকিছু রাজপথে নিয়ে জনগণকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়। এমনিতেই আমাদের তেলের ক্রাইসিস আছে। দুই দলের প্রতি পরামর্শ হলো—সংসদকে কার্যকর করা হোক। এটা মানুষ চায়। মানুষ চায় না রাজপথে আগের মতো অস্বস্তি তৈরি হোক।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জরুরি সেবা নম্বরে কল পেয়ে লঞ্চে অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসা সহায়তা দিল কোস্ট গার্ড

ছাত্রদলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা

এনসিপি নেত্রী মনিরাকে নিয়ে ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য গণঅধিকার নেতার

আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি খেলাফত আন্দোলনের

সকাল ৯টার মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে

বিভেদ ভুলে এক কাতারে অপু-বুবলী

বিএনপি দেশ ও মানুষের স্বার্থে কাজ করে : প্রধানমন্ত্রী

হুইপ অপুর কাছে ছাউনি চাইল পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী

নিরব-পরীমণির গোলাপ নিয়ে নয়া পরিকল্পনা

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন মোদি

১০

ব্রাজিলের ম্যাচের দিনে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের শোভাযাত্রা

১১

শম্পার নতুন গান ‘প্রেমের বিজ্ঞাপন’

১২

গাইবান্ধায় রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিত : বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্বেগ

১৩

জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি মনু গ্রেপ্তার

১৪

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ৮৮ বছর ধরে অপরাজিত ব্রাজিল

১৫

ব্রাজিল সমর্থকদের আনন্দ মিছিল রূপ নিল বিষাদে

১৬

ইরানে শান্তিচুক্তি পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের বৈঠক 

১৭

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ  / স্কুলে যাতায়াতে শিক্ষার্থীদের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করলেন সংসদ সদস্য

১৮

‘ভবিষ্যতে সফল হতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিকল্প নেই’

১৯

রুহুল আমীন রাজুর গল্প : লাশ কাটা ঘর   

২০
X