

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে বলে আশা করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। আগেও বেতন বাড়ানোর সময় বলা হয়েছিল বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু তেমন কমেনি। অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় আবার বেতন বাড়ানো হচ্ছে, এতে দুর্নীতি কমবে কি না—জবাবে তিনি বলেন, কমার কথা। কারণ, অভাব থাকলে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে।
১১ বছর ধরে নতুন বেতন কাঠামো হয়নি। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এগুলোকে তো ‘অ্যাড্রেস’ করতে হবে, তাই না? আশা করা হচ্ছে, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে আমাদের স্লোগান হচ্ছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’। আগে অর্থনীতি ছিল কিছু গোষ্ঠীর জন্য। সেই জায়গা থেকে অর্থনীতিকে আমরা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে চাই। এ কারণে প্রতিটি মানুষের কথা চিন্তায় রেখে বাজেট করা হয়েছে। কেউ এই বাজেটের আওতার বাইরে নেই। এ সময় তিনি বলেন, এই বাজেট কোনো দলীয় লোকের নয়। বাজেট তৈরি করা হয়েছে সব নাগরিকের জন্য। যারা বিএনপিকে ভোট দেননি, এই বাজেটের সুফল তারাও পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শাখাওয়াত হোসেন বকুল, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী আমিনুর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
এবারের বাজেটের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী। এতে বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দক্ষ একজন শ্রমিকের জন্য দেশের পাশাপাশি বিদেশেও চাকরি পাওয়া সহজ হবে। এ জন্য দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক নানা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ পুলিশ, র্যাব কিংবা সরকারি লোক দিয়ে পিটিয়ে করার কোনো বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন, মূল্যস্ফীতি তিন মাসের ব্যাপার নয়। এটি বেশ কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। তিন মাস ধরে তা ৯ শতাংশের ওপরে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব রয়েছে।
লুটপাট ও মানিলন্ডারিংয়ের কারণে ব্যাংকগুলোতে মূলধনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর ফলে তহবিল খরচ অনেক বেড়ে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক পড়েছে মূল্যস্ফীতির ওপর। আবার বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানি করা সব পণ্যের দামও দেশের বাজারে বেড়ে যাচ্ছে। বহির্বিশ্বের কারণে যে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, সেখানে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে অভ্যন্তরীণভাবে কীভাবে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা যায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সহজে ব্যবসা করার সূচকের মানদণ্ডে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ একেবারে তলানিতে। এর অর্থ হলো, আমাদের ব্যবসায় খরচ অনেক বেশি। একটি অনুমতি পেতে বা কোম্পানি করতে ছয় মাস থেকে এক বছর লেগে যায়। অনেক দপ্তরে যেতে হয়, সময় নষ্ট হয় এবং অনেক জায়গায় খরচ করতে হয়। এই প্রক্রিয়া সহজ করতে বিনিয়ন্ত্রণকরণ করা হচ্ছে।
বিনিয়োগ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ডি-রেগুলেশন বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা জরুরি। এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হবে। এতে অর্থনীতি আবারও ঋণনির্ভরতার চক্রে আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
আমির খসরু বলেন, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ-সংক্রান্ত নীতিমালার বাস্তবায়ন তদারকিতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। কোথাও নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
সরকারি সেবা পেতে গিয়ে কেউ হয়রানি বা ক্ষতির শিকার হলে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালুর কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাস্কফোর্স ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি প্রতিটি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। কোনো কাজ বিলম্বিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং উন্নয়নের মূল ধারার বাইরে থাকা মানুষদের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানো বাজেট থেকে বঞ্চিত ছিল। জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর দেশের মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার পেয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা এখন অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে।