ফোকাস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বন্ধু থেকে শত্রু

বন্ধু থেকে শত্রু

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে একে অপরের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। চরম শত্রুতায় পরিণত এ সম্পর্ক একসময় ছিল বন্ধুত্বের। স্বার্থকেন্দ্রিক বৈশ্বিক রাজনীতিতে সম্পর্কের উত্থান-পতন দিবা-রাত্রির মতো ঘটনা। এখন ওয়াশিংটন-তেহরানের এই মল্লযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ দুই শিবিরে বিভক্ত। উত্তেজনা বাড়ছে অন্য পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যেও। একনজরে দেখে নেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের রসায়ন।

১৯৫১ সালের ২৮ এপ্রিল ইরানে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। তিনি ক্ষমতায় এসেই তেল সম্পদ জাতীয়করণ করেন। এতেই ক্ষুব্ধ হয় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স এবং এবং মার্কিন গোয়েন্দা সিআইএ ক্যু ঘটিয়ে মোসাদ্দেককে উৎখাত করে। মোসাদ্দেকের পতনের পর ক্ষমতায় ফেরেন ইরানের নির্বাসিত শেষ সম্রাট রেজা শাহ পাহলভি। পরবর্তী দুই দশক ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয় পারস্য উপসাগরের দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকেন তিনি। শাহের আমলে ইরানের তেল ব্যবসায় প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ ও আমেরিকান কোম্পানিগুলোর। কিন্তু ইরানি জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্রবিরোধী ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি গণবিক্ষোভের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রেজা শাহ পাহলভি। দুই সপ্তাহ পর দেশে ফেরেন নির্বাসিত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনি। তিনি ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লবের’ নেতৃত্ব দেন। কিছুদিনের মধ্যেই দেশটির ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে। ৪৪৪ দিন বন্দি ছিলেন ৫২ আমেরিকান। বন্দি সংকটের সমাধান না হওয়ায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। দেশটিতে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ও তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। জব্দ করা হয় ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ। বের করে দেওয়া হয় কূটনীতিকদের।

এর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইরান আক্রমণ করেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। যুদ্ধ চলাকালে ইরাককে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অর্থ, সামরিক প্রযুক্তি এমনকি রাসায়নিক অস্ত্রও সরবরাহ করে ওয়াশিংটন। এ যুদ্ধ চলে আট বছর। এ সময় লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর হামলায় বৈরুতের একটি ঘাঁটিতে ২৪৪ মার্কিন সেনা নিহত হয়।

৩ জুলাই ১৯৮৮ সাল পারস্য উপসাগরে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। নিহত হন ইরানের ২৯০ যাত্রী। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক আরও তিক্ততায় রূপ নেয়।

এর মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যায় ইরান। তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগে দেশটিকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচার চালায় বিল ক্লিনটন প্রশাসন। ১৯৯৬ সালে বিদেশি কোম্পানিগুলোর ইরানে বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ওয়াশিংটন। ১৯৯৮ থেকে পরবর্তী দুই বছর মোহাম্মদ খাতামি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। এজন্য রোডম্যাপও ঘোষণা করা হয়। সে সময় সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয় এবং ইরানের পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

২০০৫ সালে মাহমুদ আহমদিনেজাদ ইরানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের আবারও অবনতি ঘটে। ইরান এ সময় পরমাণু কার্যক্রম জোরদার করে। এ জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে সন্ত্রাসের রপ্তানিকারক হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেন।

এরপর ২০১৫ সালে মার্কিন বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্র ও জোট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম স্থগিতকরণ চুক্তি করায় বৈরিতার সেই বরফ কিছুটা গলে। ২০২৭ সালে প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির করা পরমাণু চুক্তি বাতিল করেন। একের পর চাপ প্রয়োগ করতে নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেন। শুরু হয় ছায়াযুদ্ধ। ৩ জানুয়ারি ২০২০ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে বিমান হামলায় হত্যা করে। তিনি ছিলেন ইরানের বিশেষায়িত বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস শাখার প্রধান। এ ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। জবাবে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় তেহরান। চলতে থাকে হামলা-পাল্টা হামলার হুমকি। ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাসের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র ইসরায়েল।

২০২৪ সালের ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে বোমা হামলা চালায় ইসরায়েল। ১৩ এপ্রিল ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালায় ইরান ও তার মিত্ররা।

১৩ জুন ২০২৫ ইরানে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েল। পারমাণবিক স্থাপনা এবং সামরিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টার্গেট করে বিমান হামলা চালায় তেলআবিব। ওই রাতে জবাব দিতে শুরু করে তেহরান। এর মধ্যে ২২ জুন ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসপাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে বিমান হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে বোম ব্লাস্টার ফেলে তারা। পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় ক্রুজ মিসাইল। জবাবে ২৩ জুন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করে ইরান। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়ছে। চলছে হামলা-পাল্টা হামলার হুমকি।

এরপর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ইরানি রিয়ালের দরপতনে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে এ আন্দোলন রূপ নেয় সরকারবিরোধী আন্দোলনে। আর তাতে দমনপীড়ন চালায় খামেনি প্রশাসন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে ইরানে হামলা চালাবে পেন্টাগন। তবে সেই হামলা আসন্ন কি না তা সময়ই বলবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জানুয়ারির ১৭ দিনে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি যে ৮ ব্যাংকে 

এলপিজি নিয়ে সুখবর দিল সরকার

পরিত্যক্ত ভবনে ৬ মরদেহ, সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ল সিরিয়াল কিলার

সিরিয়া সরকার ও এসডিএফের যুদ্ধবিরতি চুক্তি

পাকিস্তান পয়েন্টে চা খেয়ে ফেরা হলো না ২ ভাইয়ের 

দেশের উন্নয়নে তরুণদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ : নুরুদ্দিন অপু

জেআইসিতে গুম-নির্যাতন / শেখ হাসিনা ও ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু আজ

উচ্চ রক্তচাপে লবণ একেবারে বাদ? শরীরে হতে পারে যে সমস্যাগুলো

বিচ্ছেদের পর সুখবর দিলেন তাহসান খান

বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সুযোগ হারাল আর্সেনাল

১০

ঢাকায় শীত নিয়ে আবহাওয়া অফিসের বার্তা

১১

সকাল থেকে টানা ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

১২

পরিত্যক্ত ভবনে রহস্যজনক মৃত্যু, ঝলসানো ২ মরদেহ উদ্ধার

১৩

সাইকেল চালানো শিখিয়েই আয় করলেন ৪৭ লাখ টাকা

১৪

চোখ ভালো আছে তো? যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন

১৫

‘নাটকীয়’ ফাইনালে মরক্কোর স্বপ্ন ভেঙে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল

১৬

ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করল ইউরোপের ৮ দেশ

১৭

দিল্লি-লাহোরের বায়ুদূষণ ভয়াবহ, ঢাকার খবর কী

১৮

গণভোট জনগণের উপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত : নুরুদ্দিন অপু

১৯

স্পেনে দুটি হাই-স্পিড ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ২১, আহত অনেকে

২০
X