বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে যে কয়েকটি নিয়ামক সব থেকে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে অন্যতম বৈদেশিক রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে রেমিট্যান্স আহরণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যে কয়েকটি দেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে, তার মধ্যেও অন্যতম বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। দেশের নাগরিক হিসেবে এটি আনন্দের। বর্তমান বিশ্বের অনেক স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আদর্শ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশের ওপর রাখতে সক্ষম হয়েছে, যদিও করোনা মহামারির সময়ে এ ধারা কিছুটা কমে যায় এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার তার পূর্বের ধারায় ফিরতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার ও বিভিন্ন খাতে যেমন কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য, যা কি না টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হবে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে কেউ কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি বললেও এ দেশের মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সেই অপবাদকে ভুল প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে উন্নয়নের রোল মডেল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বিভিন্ন সূচকে এগিয়ে রয়েছে। এমনকি প্রবৃদ্ধির ধারায় অনেকটা ফিরে এসেছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার ইস্যুতে ইন্টারনেট বন্ধ ও দেশব্যাপী সংঘাত-সংঘর্ষ ও কারফিউর প্রেক্ষাপটে চলতি জুলাইয়ে এতে পতনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৪ জুলাই পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে মাত্র ১৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৯৮ কোটি ডলার এসেছিল প্রথম ১৩ দিনে। আর ১৪ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ১০ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৫৩ কোটি ডলার। যেখানে জুন মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২৫৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন (বণিক বার্তা, ২৭ জুলাই ২০২৪)। দেশে সংঘটিত সহিংসতা, মৃত্যু ও ইন্টারনেট বন্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বের দেশে দেশে প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এমনকি এ ইস্যুতে দেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠানোর বিষয়ে ক্যাম্পেইন করছে তাদের একাংশ। এমন পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমরা জানি বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে আছে। গত তিন বছর দেশে ডলারের সংকটও তীব্র। এ পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ডলার সংকট ও বিনিময়হারের সমন্বয়হীনতার কারণে দেশে হুন্ডির বড় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে হুন্ডিকে অগ্রাধিকার দিলে অর্থনৈতিক সংকট আরও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছবে। দেশের বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বেশি উসকে উঠবে।
সাম্প্রতিক সংকটে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার প্রবাসীদের অনুরোধ জানানো হচ্ছে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে। অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠিয়ে খুব সামান্য কিছু আর্থিক সুবিধা পেলেও এতে দেশের বড় ক্ষতি হয়। দেশের এ ক্ষতির ফলে দেশে বসবাসরত প্রবাসীর পরিবার এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এই মুহূর্তে অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য দেশি-বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিদেশে লবিস্টের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষতি করার জন্য। প্রবাসীরা যাতে দেশে বৈধভাবে রেমিট্যান্স না পাঠান, সেজন্য সরকারবিরোধী চক্র অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র করে আসছে অনেক আগে থেকেই। সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার ইস্যুতে তারা আরও এ সুযোগটি নিতে চাচ্ছে।
আমরা জানি, মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানুষের জন্য চাকরির বাজার সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের জন্য এ বাজার টেকসই করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতা বিদ্যমান ছিল। হঠাৎ কোটা সংস্কার ইস্যুতে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, এতে দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই মুহূর্তে সব পক্ষেরই সচেতন হওয়া জরুরি দেশের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যেন দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে বিবেচনা করে প্রবাসীদের আন্তরিকতার কোনো বিকল্প নেই।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার ইস্যুতে গত ১৬ জুলাই দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ লেখা তৈরি করার সময় পর্যন্ত ১৫০ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ হয়েছে। সংঘাত-সহিংসতা কেন্দ্র করে গত ১৮ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। সার্বিকভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও এখন এক ধরনের উত্তেজনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ, আমেরিকার কয়েক দেশে ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রবাসীরা সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেছে। এর মধ্যে কোনো কোনো সমাবেশ থেকে রেমিট্যান্স ‘শাটডাউনের’ ঘোষণাও এসেছে।
সাধারণ দৃষ্টি থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, যারা রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের নিরুৎসাহিত করছে কিংবা যারা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বিদেশের মাটিতে, তারা কোনোভাবেই দেশের মঙ্গল চান না। তাদের নিশ্চয়ই অন্য কোনো স্বার্থ রয়েছে। কোটা সংস্কার ইস্যুতে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব থাকার পরও ক্রমাগত আন্দোলনের পাল্টাপাল্টি ঘোষণা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। প্রবাসীদের বুঝতে হবে এই মুহূর্তে দেশবিরোধী একটি চক্রান্ত শুরু হয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেকেই এ বিষয়ে সোচ্চার হয়েছে। দেশকে বিপাকে ফেলতে প্রবাসীদের বৈধভাবে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে নিরুৎসাহিত করছে। এমন অবস্থানকে নিঃসন্দেহে দেশবিরুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা যায়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেলে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষমতা কমে যাবে। কমে যাবে শিল্পোৎপাদন ও রপ্তানি। থেমে যাবে দেশের উন্নয়নের চাকা। বেড়ে যাবে দারিদ্র্য। বরণ করতে হতে পারে শোচনীয় ভাগ্য। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের। তাই সাময়িক রাজনৈতিক ডামাডোলে দেশের উন্নয়নে ভাটা পড়ুক এটি দেশের নাগরিক হিসেবে প্রবাসীরা নিশ্চয়ই চাইবেন না। দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা কোনো দেশপ্রেমিকের কাজ হতে পারে না। দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রত্যেকের কর্তব্য। দেশকে এগিয়ে নিতে শুধু সরকার নয়, সাধারণ জনগণকেও হাল ধরতে হবে। পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও হুন্ডি।
লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়