পুরাণমতে, কোজাগরি শব্দটি এসেছে ‘কো জাগর্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘কে জাগে।’ কথিত আছে, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী জগৎ পরিক্রমা করেন। তিনি দেখেন, কেউ রাতে জেগে আছেন কি না। কোজাগরি পূর্ণিমা রাতে যিনি জেগে দেবীকে স্বাগত জানান, তাকে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি প্রদান করেন।
ত্রিলোকের সকল সৌভাগ্য, শ্রী ও ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী হলেন দেবী লক্ষ্মী। আশ্বিন মাসের শেষ পূর্ণিমা তিথিতে প্রদোষকালে অর্থাৎ সন্ধ্যাকালে কোজাগরি লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন দেবী স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আগমন করেন। তিনি ভক্তদের আশীর্বাদ অর্পণ করেন।
লাল গোলাপ মা লক্ষ্মীর অত্যন্ত প্রিয়। তাই কোজাগরি লক্ষ্মীপূজার দিন মাকে অন্য ফুলের সঙ্গে অন্তত একটি লাল গোলাপ নিবেদন করা আবশ্যক। লক্ষ্মীপূজার দিন পূজার স্থানে আলপনা অঙ্কন করে নিতে হয়। এ ছাড়া ঘরের প্রবেশ দরজা ও ঠাকুরঘরের দরজায় আলপনা অঙ্কন করতে হয়। পরিষ্কার কাঠের জলচৌকির বা পিঁড়ির ওপর গঙ্গাজল ছিটিয়ে একটি লাল কাপড় বিছিয়ে নিতে হয়। এই কাপড়ের ওপর কিছুটা গঙ্গাজল, আতপ চাল, পঞ্চশস্য এবং ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিয়ে মা লক্ষ্মীর ছবি বা প্রতিমা স্থাপন করতে হয়।
মা লক্ষ্মীর কপালে সিঁদুরের ফোঁটা ও লাল চন্দনের তিলক দিতে হয়। মায়ের চরণ, বাহন পেঁচার কপালে ও চরণে লাল চন্দনের তিলক দিতে হয়। মায়ের একপাশে জলশঙ্খ ও অন্য পাশে ধানের ছড়া ও সিঁদুরের কৌটা রাখতে হয়। লক্ষ্মীর পাঁচালি ও ব্রতকথা মা লক্ষ্মীর পাশে রাখতে হয়। মাকে এই বিশেষ দিনে ভক্তরা নতুন শাড়ি, আলতা ও সিঁদুর নিবেদন করেন।
মা লক্ষ্মীর পূজা শুরু করার আগে একটি তিলের তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে নিতে হয়। এই প্রদীপ মা লক্ষ্মীর প্রিয়। এই প্রদীপ ঘরে শান্তি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে। ধূপকাঠি ও ধূপ এই পূজার অন্যতম অনুষঙ্গ।
পূজার ঘটে শীষযুক্ত ডাবে তেল সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকে নিতে হয়। পাঁচ-সাত-নয় পাতা বিশিষ্ট আম্র পল্লবের অগ্রভাগে ও মধ্যভাগে সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে ঘটে রাখতে হয়। সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে পানপাতা ঘটের ওপর রেখে তার ওপর শীষযুক্ত ডাব রাখতে হয়। পানপাতার বোঁটার অংশ স্বস্তিকা চিহ্ন বরাবর রাখতে হয়।
ডাবের ওপর একটি গামছা, গণেশের উদ্দেশ্যে একটি পৈতা, শাঁখা, পলা, চাঁদমালা, লাল চন্দন সহযোগে লাল জবা ফুলের মালা, কিছু ফুল, একটি লাল পদ্মফুল এবং তিনটি দূর্বা ও তিনটি বেলপাতা দিতে হবে।
গঙ্গামাটি, গোলাপজল ও গঙ্গাজল দিয়ে ভিজিয়ে একটি ময়াম বানিয়ে তার ওপর সিঁদুর ফোঁটা, পঞ্চশস্য, আতপ চাল, কিছু ধান, ফুলের পাঁপড়ি, দূর্বা দিতে হয়। মার পূজার ঘটের সামনে একটি কাঁসার ছোট বাটি রাখতে হয়। এর মধ্যে অর্ঘ্য প্রদান করতে হয়।
অষ্টলক্ষ্মী হলেন সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ। তারা সম্পদের আট উৎস, তথা লক্ষ্মীদেবীর শক্তির প্রতীক। অষ্টলক্ষ্মী হলেন—
১) আদিলক্ষ্মী বা মহালক্ষ্মী: লক্ষ্মীর আদিরূপ;
২) ধনলক্ষ্মী: লক্ষ্মীর অর্থ ও স্বর্ণদাত্রীরূপ।
৩) ধান্যলক্ষ্মী: কৃষিসম্পদ দাত্রী লক্ষ্মী;
৪) গজলক্ষ্মী: গবাদি পশু ও হস্তীরূপ সম্পদ দাত্রী লক্ষ্মী;
৫) সন্তান লক্ষ্মী: সন্তানপ্রদাত্রী লক্ষ্মী;
৬) বীর লক্ষ্মী বা ধৈর্যলক্ষ্মী: বীরত্ব ও সাহস দানকারী লক্ষ্মী;
৭) বিজয় লক্ষ্মী: বিজয় প্রদানকারী লক্ষ্মী;
৮) বিদ্যা লক্ষ্মী: কলা ও বিজ্ঞানের দান প্রদানকারী লক্ষ্মী;
৯) ঐশ্বর্যলক্ষ্মী: ঐশ্বর্য প্রদানকারী লক্ষ্মী;
১০) সৌভাগ্যা: সৌভাগ্য প্রদানকারী লক্ষ্মী;
১১) রাজ্যলক্ষ্মী: শাসককে আশীর্বাদ দানকারী লক্ষ্মী;
১২) বরলক্ষ্মী: যিনি শুভপ্রদ বর প্রদানকারী লক্ষ্মী।
লক্ষ্মী চঞ্চলা। তবে ক্রোধের দেবী নন। গৃহস্থ মাত্রই তাই লক্ষ্মীর ঝাঁপি করে লক্ষ্মীর পিঁড়ি পাতেন ঘরের কোণে। প্রতি বৃহস্পতিবার বা লক্ষ্মীবার অথবা গুরুবারে ফুল-বাতাসা দিয়ে অর্চনা করেন। এই সাপ্তাহিক পূজাই কোজাগরির রাতে অনুষ্ঠিত হয় বড় আকারে।
লক্ষ্মীপূজা আমাদের জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ। যার টাকাকড়ি নেই, সে লক্ষ্মীহীন। যার চরিত্রধন নেই, সে লক্ষ্মীছাড়া। সাধক লক্ষ্মীর আরাধনা করেন মুক্তিধন লাভের জন্য। সব ধন প্রার্থনায় কোজাগরির রাতে আমরা লক্ষ্মীকে স্মরণ করি বারবার। সবার কল্যাণ ও সমৃদ্ধি আসুক মা লক্ষ্মীকে লাল গোলাপ নিবেদনে।
ওঁ বিশ্বরূপাস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।
সর্বত: পাহিমাং দেবী মহালক্ষ্মী নমোহস্তুতে।।
লেখক: ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কমিটির উপদেষ্টা পুরোহিত, সম্পাদক: জয় বাবা লোকনাথ পঞ্জিকা এবং অতিরিক্ত সচিব (অব.)