শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২
শাহ আহমদ রেজা
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ০২:১৭ এএম
আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:৫৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ভাসানী

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ভাসানী

পূর্বে প্রকাশের পর

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে, নিজেকে রক্ষার এবং গণঅভ্যুত্থানকে বিভ্রান্ত ও নস্যাৎ করার কৌশল হিসেবেই আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করেছিলেন। একই কারণে মওলানা ভাসানী নিজেই শুধু বর্জন করেননি, শেখ মুজিবকেও বৈঠকে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য যেহেতু কোনো গোলটেবিল বৈঠকের প্রয়োজন পড়েনি, সেহেতু স্বায়ত্তশাসনসহ ১১ দফার বাকি দাবিগুলোও আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করা যাবে। এটা যুক্তিরও কথা ছিল। অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর পরামর্শ উপেক্ষা করে শেখ মুজিব ২৬ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ফাঁদে পা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়েছিলেন। এ প্রক্রিয়ায় আইয়ুব খানের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানিদের কৌশলই সফল হয়েছিল। ছাত্র-জনতা শেখ মুজিবের দিকে আশায় তাকিয়ে থাকায় এবং মাঝখানে ঈদুল আজহার ছুটি পড়ে যাওয়ায় গণঅভ্যুত্থান স্তিমিত হয়েছিল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আইয়ুব খান পদত্যাগ করে সরে গিয়েছিলেন, পাকিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো প্রবর্তিত হয়েছিল সামরিক শাসন (২৫ মার্চ, ১৯৬৯)। সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

জনপ্রিয়তার প্রভাব ব্যবহার করে নিজের বিস্মৃতপ্রায় কর্মসূচি ৬ দফাকে পুনর্বাসিত করার পথেও শেখ মুজিব জনগণকে নিরাশ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের জুন আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে ষড়যন্ত্র মামলার শুনানির সময়কাল তথা ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জনগণের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতার কারণে কেবল নয়, ৬ দফাবিরোধী আওয়ামী লীগপ্রধান নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে ড্যাকের আওয়ামী লীগের যোগদানের অবমাননাকর ঘটনার মধ্য দিয়েও ৬ দফা ব্যর্থতা এবং এর প্রতি জনগণের সমর্থনহীনতার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। তার পরও শেখ মুজিব তার ৬ দফাকেই তুলে এনেছিলেন। কারণ, ১১ দফার মধ্যে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি জনতার মুক্তির লক্ষ্যাভিসারী সঠিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। শেখ মুজিবের পক্ষে ১১ দফার মতো প্রগতিশীল কর্মসূচি সমর্থন ও গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। আসলে জনগণের মুক্তি অর্জনের মৌলিক প্রশ্নেই শেখ মুজিবের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি ছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। সেইসঙ্গে ছিল নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও। না হলে ১১ দফাকে নিয়েই তিনি এগিয়ে যেতেন। কেননা, এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা দুটি মূলত তার ৬ দফার আলোকে প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু উচিত হলেও তিনি তা করেননি। বরং কিছুদিন পর্যন্ত ‘১১ দফা ও ৬ দফা’ বলার পর ধীরে ধীরে গোটা ১১ দফাকেই তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন, ধরে রেখেছিলেন নিজের ৬ দফাকে। নির্বাচনী কর্মসূচিও তিনি ৬ দফাকেই বানিয়েছিলেন। জনপ্রিয়তার প্রভাব খাটিয়ে এমন এক প্রচারণাকেও শক্তিশালী করেছিলেন যেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল ৬ দফার ভিত্তিতেই! যেন ১১ দফা কোনো বিষয় ছিল না! আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এখনো, এত বছর পরও অমন প্রচারণাই চালানো হয়।

অন্যদিকে, তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস কিন্তু এ ধরনের দাবি ও প্রচারণাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয় না। যে কেউ ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জানার জন্য সে সময়ের পত্রপত্রিকা পড়ে দেখতে পারেন। দেখবেন, আইয়ুবের পতন ঘটেছিল আসলে অসামরিক প্রশাসন ভেঙে পড়ায়। মওলানা ভাসানীর আহ্বানে—বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামাঞ্চলে আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠেছিল। বিডি মেম্বার ও চেয়ারম্যানদের মানুষ ঘেরাও করেছে, অনেককে গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে পিটিয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। একযোগে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে তহশিল অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে। অবস্থা বেগতিক দেখে বিডি মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা দলে দলে পদত্যাগ করেছেন। শেষদিকে পুলিশও সরকারের আদেশ মানতে চায়নি। সবকিছুর পেছনে ছিল মওলানা ভাসানীর ভূমিকা। তার সে ভূমিকার জন্য বিশ্বের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘টাইম’ ম্যাগাজিন মওলানা ভাসানীকে ‘প্রোফেট অব ভায়োলেন্স’ আখ্যা দিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের সময় মওলানা ভাসানীকে নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনি প্রকাশ করেছিল। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে লেখা আইয়ুব খানের চিঠির মধ্যেও এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এতে আইয়ুব খান প্রধানত প্রশাসন ভেঙে পড়ার এবং অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণই জানিয়েছিলেন। আইয়ুব খানের এ চিঠির ভিত্তিতেও এ কথা অন্তত বলার সুযোগ নেই যে, গোলটেবিল বৈঠকের ব্যর্থতার কারণে তাকে সরে যেতে হয়েছিল। বাস্তবে তাকে উৎখাত করেছিল ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান।

আলোচনার সমাপ্তিকালে বলা যায়, মওলানা ভাসানী ছাড়া অন্য নেতাদের অসততা, ষড়যন্ত্র, দৃষ্টিভঙ্গি এবং গণবিরোধী অবস্থান ও ভূমিকার কারণে সম্পূর্ণ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলেও জনগণের অংশগ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সম্পূর্ণরূপে বিজয় অর্জন করেছিল। সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত ও স্তিমিত এই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও প্রেরণা পরবর্তী সময়ও জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং অনিবার্য করে তুলেছে ১৯৭১-এর স্বাধীনতাকে। বিশ্লেষণের এই দৃষ্টিকোণ থেকে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে প্রধান ভূমিকা ছিল মওলানা ভাসানীর। (সমাপ্ত)

লেখক: সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নুরকে দেখতে এসে আসিফ নজরুল অবরুদ্ধ 

আহত নুরকে দেখতে ঢামেকে প্রেস সচিব

সহিংসতার ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিবৃতি

সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি : হাসনাত

মাদুশঙ্কার হ্যাটট্রিকে লঙ্কানদের রুদ্ধশ্বাস জয়

নুরের ওপর হামলার কড়া প্রতিবাদ ছাত্রদলের

ভারতীয় বক্সারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হাসান শিকদার

আসিফ নজরুলকে তুলোধুনো করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিল গণঅধিকার পরিষদ

ইংল্যান্ড সফরের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণা

১০

নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী নেদারল্যান্ডস কোচ

১১

‘মার্চ টু জাতীয় পার্টি অফিস’ ঘোষণা

১২

‘নুরের ওপর হামলা পক্ষান্তরে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর হামলা’

১৩

লজ্জাবতী বানরের প্রধান খাদ্য জিগার গাছের আঠা!

১৪

নুরের শারীরিক সর্বশেষ অবস্থা জানালেন রাশেদ

১৫

আকাশ বহুমুখী সমবায় সমিতি ১৯তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

১৬

শ্রীমঙ্গলে পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ 

১৭

মৌলিক সংস্কার শেষে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে : ডা. তাহের

১৮

২০ বল করার জন্য ৩৪ হাজার কিলোমিটার উড়ে যাচ্ছেন অজি স্পিনার

১৯

সড়কে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব / যানজট নিরসনে ভুমিকা নেওয়ায় সুবিধাভোগীদের রোষানলে পুলিশ কর্মকর্তা

২০
X