বিজয় অর্জনের চেয়ে, তা রক্ষা করা কঠিন—এ কথা স্বতঃসিদ্ধ। এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত মিলছে সিরিয়ায়। কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও স্বার্থান্বেষী মহল ২০২৪-এর বিপ্লবের ফলকে প্রতিহত করতে উদ্যত হয়েছে। বস্তুত রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের গতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তারা বিচলিত হয়ে পড়েছে। তবে সিরিয়ার সমাজব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা বিপ্লবের সময়ই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে দেশের অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত কিছু শক্তি তাদের নিজেদের স্বার্থ আদায়ে তৎপর হয়ে উঠবে।
এটা সিরিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়ের কোনো ক্ষণস্থায়ী পর্ব নয়, বরং ৫৪ বছর স্থায়ী হওয়া কঠোর শাসনব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ এবং সেই ব্যবস্থা থেকে লাভবান হওয়া ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গঠিত জোটের কারসাজি। এর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে দীর্ঘকালব্যাপী রাষ্ট্রীয়ভাবে নিবর্তিত সুপরিকল্পিত মগজ ধোলাই, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের সমর্থন ও আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ।
সিরিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির যেই তাৎপর্যপূর্ণ মঞ্চগুলো রয়েছে, তার মধ্যে এ রাষ্ট্র একটি। এই দেশ মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। আর মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। সভ্যতা, সংস্কৃতি আর ধর্মের সূচনা হয়েছে এই ভূখণ্ডে। এক মহাদেশের সঙ্গে অন্য মহাদেশের বাণিজ্যিক পথ, এক জাতির সঙ্গে অন্য জাতির রণক্ষেত্র, পাশ্চাত্যের জন্য প্রাচ্যের জানালা এবং প্রাচ্যের জন্য পাশ্চাত্যের প্রবেশদ্বার এ সিরিয়া। এই ভূমির অধিবাসীরা বিশ্বকে বর্ণমালা উপহার দিয়েছে, এই ভূমিতে জন্ম হয়েছে এমন সব বৈশ্বিক ধর্মের যার অনুসারীরা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বব্যাপী। ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সময়ে এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সাম্রাজ্য, যাদের সম্রাটদের শক্তির উৎস ছিল এখানকার উর্বর ভূমি।
মানবজাতির পরবর্তী অধ্যায় রচনার অধিকাংশ ঐতিহাসিক ঘটনায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এই সিরিয়া অঞ্চল। ইসলামী বিজয় যুগ থেকে পশ্চিমা খ্রিষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ, উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা—সব ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী এই ভূমি। তবে বিংশ শতাব্দীর নতুন বিশ্বব্যবস্থা লেভান্ত অঞ্চলকে বিভাজিত করে ফেলেছে এবং এখানে আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে, প্রথমে সাইক্স-পিকো চুক্তি এবং পরবর্তীকালে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে। এ দুই ঐতিহাসিক মোড়ের পরিণতি এখনো এই অঞ্চলের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। স্বভাবতই যেমনটা অনেকে পূর্বানুমান করেছিলেন তেমনটাই ঘটছে, সিরিয়াকে বর্তমানে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
প্রথমত, যে স্তম্ভিত অবস্থার মধ্য দিয়ে বাশার আল আসাদের শাসনের সমাপ্তি ঘটেছিল এবং আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষক ইরানের ‘বেলায়াত-এ ফাকিহ’ শাসনব্যবস্থার আধিপত্য সুসংহত হয়েছিল, তা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তেহরান পুনরায় ভারসাম্য ফিরে পেয়েছে এবং পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছে, যা সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের গতিধারাকে ব্যাহত করছে। প্রতিবেশী দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে চাওয়ার পেছনে বহু কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো—ইসরায়েলের কাছে লেবাননে পরাজিত হওয়ার পরও ইরান যে এখনো এক শক্তিশালী আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে বিরাজমান, তা প্রমাণ করা। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের আত্মপ্রকাশ করতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতেই মূলত ইসরায়েল তার আক্রমণ চালিয়েছে। এর জন্য ইসরায়েলের পাশাপাশি তুরস্ককেও খেসারত দিতে হয়েছে। তবে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, তেহরানের শাসকগোষ্ঠীদের ক্ষমতা থেকে অপসারণে তেল আবিব বা ওয়াশিংটন কোনো পক্ষেরই আগ্রহ নেই। এর একটি অন্যতম কারণ হলো, ফিলিস্তিনি ঐক্য বিনষ্টে ও ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে দুর্বল করার পেছনে তেহরানের ভূমিকা রয়েছে। লেবাননের ভূখণ্ডে কোনো নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তও আরও একটি কারণ।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল একমুহূর্তের জন্যও তার ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো ভুলে যায়নি, যার প্রধান একটি হলো তার প্রাচীন মেসিয়ানিক স্বপ্নÑইউফ্রেটিস থেকে নীলনদ পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডের ওপর সর্বাত্মক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। বস্তুত এ স্বপ্নই চরমপন্থি, বর্ণবাদী ও জনসংখ্যা স্থানান্তরের প্রবক্তাদের সাহস জুগিয়েছে, যারা এক বিপর্যস্ত ভূমি এবং তার অবসন্ন ও দিশাহীন অধিবাসীদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যেই বিভেদ তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগানো এই লক্ষ্য অর্জনের এক অন্যতম কৌশল। এই বিভেদ তৈরিতে তেহরানেরও ভূমিকা আছে, যাকে পুঁজি করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার স্বপ্ন দেখছে—প্রথমে গাজার ভূখণ্ড এবং তারপর পশ্চিম তীর থেকে। আর এ উচ্ছেদের স্রোতে ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিকরাও রেহাই পাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে আর্থিক সাহায্য এবং অবাধ সমর্থন দিয়ে ক্ষান্ত হননি, একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন মানুষদের নিয়োগ দিচ্ছেন যারা এ অঞ্চলকে আরও বিভক্ত করতে আগ্রহী।
তদুপরি সিরিয়া এবং তার বহুত্ববাদী সামাজিক ব্যবস্থা বহুকাল ধরেই ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু, যারা এ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে তেল আবিব সুকৌশলে সন্দেহ ও ভয়ের আবহ সৃষ্টি করে আসছে। তারা এ অঞ্চলের মানুষের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এবং তাদের মধ্যে এমন মনোভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যা দুর্বলচিত্তের নাগরিকদের কিছু বিকৃত বিশ্বাসে প্ররোচিত করে তুলছে। এর ফলে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তাদের নিজেদের স্বদেশবাসী—যাদের সঙ্গে তারা একই মাতৃভূমিতে অবস্থান করে, একই পরিচয় ধারণ করে, তাদের হাত থেকেই সুরক্ষা প্রয়োজন। সিরিয়া আর লেবাননে এমন বিভাজনের বীজ বপন করা ইসরায়েলের অন্যতম লক্ষ্য।
অন্যদিকে আসাদ সরকারের সঙ্গে পুরোনো মজবুত ও গভীর সম্পর্ক থাকায় ইরান চেষ্টা চালিয়েছে সিরিয়ায় পরিবর্তনের গতিধারাকে প্রতিহত করতে। সিরিয়ার অভ্যন্তরে তেহরানের ক্ষমতাধর অঞ্চল হলো তারতুস শহর ও লাতাকিয়া উপকূল, যেখানে তারা আলাওয়ি সম্প্রদায়ের মনে ভীতির সঞ্চার করে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায়ে রেখেছে। আবার ইসরায়েল নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুজ সম্প্রদায়কে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ সিরিয়ার কুনেইত্রা, দেরা ও সুয়ায়দা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে। তেল আবিব এ অঞ্চলের এমন সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাচ্ছে যাদের উৎপত্তি ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও অনেক পূর্বে। এই অঞ্চলে তাদের মিত্র শক্তিকে তেল আবিব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ২০১৫ সালে ইদলিব প্রদেশের কালব লাওজাহ গ্রামে নুসরা ফ্রন্ট কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা এবং ২০১৮ সালে সুয়ায়দার পূর্বাঞ্চলে দায়েশের পরিচালিত রক্তক্ষয়ী হামলার কথা। এই স্মৃতি উসকে দিয়ে ইসরায়েল তাদের স্বার্থসিদ্ধির পথ সুগম করতে চেয়েছে।
এ ছাড়া রয়েছে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বাঞ্চলে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রকল্প। গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের আধার হওয়ার পাশাপাশি, এই অঞ্চল মার্কিন ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দু এবং একই সঙ্গে ইরান ও তুরস্কের মধ্যে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান। সিরিয়ার কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী যত দুর্বল হয়ে পড়বে, কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও তত প্রবল হয়ে উঠবে। স্বাধীনতার জন্য তারা সিরিয়ার আরব পরিচয়কে প্রত্যাখ্যান করে, জাতীয় সংহতির বিরোধিতা করে, শত্রুর সঙ্গে আপস করতেও প্রস্তুত।
সিরিয়ার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ওপর উল্লিখিত প্রতিটি শঙ্কার গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অবগত। তাদের আন্তরিক উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও, এ পর্যন্ত তারা যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, তা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে রাজনৈতিক পন্থায় রাষ্ট্রগঠনের কাজ শুরু করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় শাসনভার গ্রহণে একাধিক পক্ষের আগ্রহ থাকলেও, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদায়নের ক্ষেত্রে একপক্ষের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে এবং তাদের ভুলগুলোকে স্বীকার না করার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। এটা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ আন্তর্জাতিক নজরদারির পাশাপাশি সিরিয়ার সরকারকে আঞ্চলিক ষড়যন্ত্রেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
গত ৫৪ বছর স্থায়ী হওয়া ব্যবস্থার বিরোধিতা করতে গিয়ে নতুন শক্তির সমর্থক গোষ্ঠীরা অনেক জায়গায়ই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নীরবতা পালন করছে। জনপদের দুর্বল অংশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে যে নৃশংসতা দেখা যাচ্ছে এবং দক্ষিণ অঞ্চলে যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা মোটেই কাম্য নয়। এই জাতীয় ঘটনাপ্রবাহ বিশৃঙ্খলাকে বৈধতা দেয় এবং বিরোধী শক্তির জন্য ষড়যন্ত্রের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই অঞ্চলে এখন প্রতিশোধপরায়ণতার সময় নয়, এখন সময় অন্তর্বর্তীকালীন লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার।
লেখক: লন্ডনভিত্তিক পত্রিকা ‘আশারক আল-আওসাত’-এর নির্বাহী সম্পাদক। নিবন্ধটি আরব নিউজের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ
মন্তব্য করুন