গাজীপুরে গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যার ঘটনা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। এ নৃশংস ঘটনার শুরু হানিট্র্যাপকে কেন্দ্র করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনার ভুক্তভোগীকে কোপানোর ভিডিও ধারণ করায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক তুহিনকে। খবরে প্রকাশ, ধারণ করা ভিডিও ডিলিট না করায় (না মোছায়) তুহিনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ঘটনার শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাদশা নামে এক ব্যক্তি একটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে ২৫ হাজার টাকা তোলার পর। সে সময় পারুল আক্তার ওরফে গোলাপী নামে এক নারী তাকে ‘হানিট্র্যাপ’-এ ফেলার চেষ্টা করে। বিষয়টি টের পেয়ে বাদশা গোলাপীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং তাকে ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে সরে আসার চেষ্টা করেন। গোলাপীর বিরক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে বাদশা তাকে ঘুসি মারলে পাশেই থাকা ওই নারীর সহযোগী প্রতারণা ও ছিনতাই চক্রের সদস্যরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাদশাকে কোপাতে থাকে। প্রাণ বাঁচাতে বাদশা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা তাকে ধাওয়া দেয়। এই পুরো ঘটনার ভিডিও নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করছিলেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন। ভিডিও ধারণের বিষয়টি দুর্বৃত্তরা দেখে ফেললে, তারা তুহিনকে ভিডিও ডিলিট করতে বলে। কিন্তু তুহিন রাজি না হওয়ায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে তুহিন একটি মুদি দোকানে আশ্রয় নিলে সেখানেই তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরপরই একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
আরও উদ্বেগের বিষয় এই যে, গাজীপুরের মতো ফেনীর আরও পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে করা তাদের পরিকল্পনা গোয়েন্দা তৎপরতায় ফাঁস হয়েছে। রোববার কালবেলা অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার (৯ আগস্ট) রাতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ফেনী সংবাদদাতা ও দৈনিক ফেনীর সময় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন ফেনী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ জানিয়েছে, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘একতাই শক্তি’ নামের ছাত্রলীগ-যুবলীগের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ফেনীর পাঁচ সাংবাদিককে টার্গেট করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন ছাড়াও যমুনা টিভির স্টাফ রিপোর্টার আরিফুর রহমান, দৈনিক ফেনীর সময়-এর প্রধান প্রতিবেদক আরিফ আজম, এখন টিভি প্রতিনিধি সোলায়মান হাজারী ডালিম ও এনটিভি অনলাইন রিপোর্টার জাহিদুল আলম রাজন রয়েছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে। তুহিন হত্যার ঘটনায় পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছে। এই অপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি করে এলেও সরকার তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। পুলিশের লোকবলের অভাব আছে—এই অজুহাত দেশের মানুষ আর শুনতে চায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও সেনাসদস্যরাও নিয়োজিত আছেন। এতগুলো বাহিনী দায়িত্বে থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে মানুষ কীভাবে ভরসা পাবে?
আমরা মনে করি, দেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। পরাজিত অপশক্তি নানা প্রক্রিয়ায় দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে তৎপর রয়েছে। এমতাবস্থায় জননিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সজাগ থাকতে হবে।
মন্তব্য করুন