কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:২৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

নিরক্ষরতা বৈষম্যকে গভীর করে

আরিফুল ইসলাম রাফি
নিরক্ষরতা বৈষম্যকে গভীর করে

মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে শিক্ষা সবসময়ই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করে, জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে এবং তাকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। যে সমাজে মানুষ পড়তে ও লিখতে জানে না, সে সমাজ টেকসই উন্নয়নের পথে কখনোই এগোতে পারে না। তাই সারা বিশ্বেই সাক্ষরতার প্রসারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই ইউনেসকো একসময় বলেছিল, ‘Literacy is the key to human rights, empowerment and sustainable development.’

তবুও পৃথিবীতে এখনো কোটি কোটি মানুষ মৌলিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। নিরক্ষরতা শুধু দারিদ্র্য বাড়ায় না, এটি বৈষম্য ও সামাজিক বৈপরীত্যকেও গভীর করে তোলে। মানুষ তখন তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং সমাজে পিছিয়ে পড়ে। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ইউনেসকো ১৯৬৫ সালে এ-বিষয়ক একটি দিবসও ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য একটাই— বিশ্ববাসীকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার প্রেরণা দেওয়া এবং আজীবন শিক্ষার সুযোগকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা।

একবিংশ শতাব্দীতেও নিরক্ষরতার সমস্যাটি রয়ে গেছে। ইউনেসকোর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে এখনো প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ পড়তে-লিখতে জানে না, এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নারী। প্রায় ৬ কোটি শিশু এখনো প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে। সাব-সাহারা, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং আরব বিশ্বের কিছু অঞ্চলে নিরক্ষরতার হার সবচেয়ে বেশি। এমনকি অনেক দেশে শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মৌলিক পাঠ দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যথেষ্ট নয়, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

সাক্ষর জনগোষ্ঠী একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। একজন শিক্ষিত শ্রমিক যেখানে দক্ষ হয়ে বেশি আয় করতে পারে, সেখানে নিরক্ষর শ্রমিক সাধারণত স্বল্প আয়ের কাজে সীমাবদ্ধ থাকে। গবেষণা বলছে, এক বছরের অতিরিক্ত শিক্ষা একজন মানুষের আয় গড়ে ১০ শতাংশ বাড়ায়। শিক্ষিত মানুষ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সচেতন হয়, রোগ প্রতিরোধে সতর্ক থাকে। বিশেষ করে যেখানে মা সাক্ষর, সেখানে শিশুর টিকা দেওয়া ও পুষ্টি গ্রহণের হার অনেক বেশি। ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতা শুধু বই পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও এর অন্তর্ভুক্ত। মোবাইল ব্যাংকিং, ইমেইল বা অনলাইন আবেদন—সবকিছুর জন্য পড়তে-লিখতে জানাটা জরুরি। তা ছাড়া নিরক্ষর জনগোষ্ঠী সাধারণত ভোটাধিকার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে না, সরকারি নীতি বোঝে না, নিজের অধিকার রক্ষা করতেও হিমশিম খায়। তাই শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে সাক্ষরতার বিকল্প নেই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে সরকার ও এনজিও একসঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচি চালু করে। ফলে সাক্ষরতার হার দ্রুত বাড়তে থাকে। নব্বইয়ের দশকে নারী শিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা নারীদের শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা রাখে। ২০১০ সালের পর থেকে ডিজিটাল কনটেন্ট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো উদ্যোগ বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। ২০২২ সালের ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, এর হার ছিল ৭৪.৬৬ শতাংশ। তবে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। দেশে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয়ের দুর্বল অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, কিশোরী মেয়েদের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাওয়া, অনেক মানুষ মৌলিক পড়ালেখার দক্ষতা থেকেও বঞ্চিত থাকা।

এত প্রতিবন্ধকতা ও ব্যর্থতার মাঝে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। মেয়েদের জন্য বৃত্তি ও স্টাইপেন্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। অনলাইন লার্নিং ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু হয়েছে।

অন্যদিকে কিউবা, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশ সাক্ষরতা বিস্তারে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশও চাইলে এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে। সুতরাং সাক্ষরতা শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ-জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজকের নামাজের সময়সূচি

ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে ইসরায়েল : ট্রাম্প

যশোরে আ.লীগ-যুবলীগের তিন নেতা গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার পদত্যাগ

নিখোঁজের ৪ দিন পর প্রবাসীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ক্যানসার শনাক্তে দেশে প্রথম রোবটিক প্রোস্টেট বায়োপসি হলো স্কয়ারে

আমার কথা বলে তাহেরী হুজুর আলোচনায় থাকতে চান : সামান্তা

অভিষেক ম্যাচেই ৪৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ভারতীয় ক্রিকেটার 

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলায় ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

১০

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

১১

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

১২

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

১৩

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

১৪

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৫

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

১৬

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

১৭

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১৮

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১৯

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

২০
X