

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। এ যোগদান ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা, যা পরবর্তীকালে দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর বিএনপি এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দলটি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনার সংকটে পড়েছিল। এমন এক সময়ে খালেদা জিয়ার দলে যোগদান বিএনপিকে নতুন শক্তি ও প্রাণসঞ্চার করে। রাজনীতিতে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও তার সততা, ব্যক্তিত্ব, সাহস এবং জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি অটল বিশ্বাস অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে দলের নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীকে পরিণত করে। তিনি ধীরে ধীরে বিএনপিকে একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও গণমুখী রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮২ সালেই বাংলাদেশে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক স্বৈরাচারের এ সময়কাল ছিল গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এক ভয়াবহ অধ্যায়। এ দুঃসময়ে খালেদা জিয়া আপসহীন নেতৃত্ব নিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন। তিনি রাজপথে আন্দোলন, গণসমাবেশ এবং রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত করেন। বারবার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হুমকির মুখেও তিনি আন্দোলন থেকে পিছপা হননি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার দৃঢ় ও সাহসী নেতৃত্ব ধীরে ধীরে তাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে তিনি ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয় এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তিকেও ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়।
১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে খালেদা জিয়ার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয়। তিনি শুধু আন্দোলনের নেতৃত্ব দেননি, বরং গণতান্ত্রিক চেতনা ও সংসদীয় ব্যবস্থার গুরুত্ব জনগণের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করেন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করেন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে নারীর নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে যে সাহস, দৃঢ়তা ও আদর্শনিষ্ঠতা থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ইতিহাস গড়া সম্ভব।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিএনপিতে যোগদান শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিএনপিকে শক্তিশালী করা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার অবদান তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নেত্রী হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
মন্তব্য করুন