আমেরিকা কি ক্রমেই একা বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে? আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে আজ এমন প্রশ্ন দিন দিন বিস্তার লাভ করছে। চলতি বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে সাম্প্রতিক বিতর্ক, সেইসঙ্গে দলের আলোচিত নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা পর্যবেক্ষণের পর সর্বমহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যে, রিপাবলিকান পার্টি কি তার বিদেশ নীতিতে একলা চলো মনোভাব বা বিচ্ছিন্নতাবাদকে আলিঙ্গন করছে? ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন রাজনীতির ডান ও বাম উভয় ধারায়ই একলা চলো নীতি অনুসরণের প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার একলা চলো ধারণাটি সময়ের পরিবর্তন এবং আদর্শগত কারণে দেশ, কাল ও পাত্রভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।
বিচ্ছিন্নতাবাদ বা একলা চলো নীতি বলতে ঠিক কী বোঝায়, সে বিষয়ে কোনো ঐকমত্য নেই। সাধারণত এমন নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাকি বিশ্বের সামরিক ও রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে রাখার কোনো না কোনো রূপ জড়িত থাকে। তবে ব্যতিক্রমও আছে। পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বিস্তার, বৈশ্বিক বাণিজ্যে মার্কিন স্বার্থরক্ষা করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে থাকলে এ ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে বিভিন্ন মহল দ্বারা অনেক ব্যতিক্রম সাধিত হওয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদ বা একলা চলো নীতি একটি খুব অস্পষ্ট ধারণা হয়ে উঠেছে।
কিছু গবেষক যুক্তি দেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি দেশটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ১৮৯৮ সালের স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাকামী বা একলা চলো ধরনের ছিল। আবার অনেক গবেষক তা মনে করেন না। দেশের ইতিহাসে প্রথম দিকের কিছু প্রভাবশালী নেতা আমেরিকা প্রশাসনকে বিদেশি ফাঁদে পড়ার ঝুঁকির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। কয়েক দশক ধরে মার্কিন নেতারা পশ্চিমা আধিপত্য সম্প্রসারণ এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তারা একলা চলো নীতি অনুসরণ করেছেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী বছরগুলোতে আমেরিকা অর্থনৈতিক সমস্যায় কাবু হয়ে পড়েছিল এবং ইউরোপে একটি নতুন যুদ্ধে আমেরিকার জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনায় ছিল। সেই সময়টিকে প্রায়ই মার্কিন একলা চলো নীতি অনুসরণের স্বর্ণযুগ বলে মনে করা হয়। যাইহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ওয়াশিংটন বৈদেশিক বিষয়ে একটি সুদৃঢ় বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে। এই নীতির আলোকে মার্কিন প্রশাসন আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং সমগ্র বিশ্বে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সম্প্রসারিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একাধিক কারণে আমেরিকার বৈদেশিক নীতি এবং প্রথাগত যুদ্ধোত্তর নীতি প্রণয়নকারী নেতাদের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। আজ অনেক আমেরিকার নাগরিকেরই দেশটির অনুসৃত এ বৈশ্বিক নীতি এবং পদ্ধতির বিষয়ে মোহভঙ্গ ঘটেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে দুই দশক ধরে চলা সংঘাতের মতো একাধিক কারণে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি প্রণেতা ও যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র বিষয়ে প্রথাগত পদ্ধতির প্রবর্তক নেতাদের প্রতি জনগণের আস্থা কমতে থাকে। কিছু বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান (যার যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে) একলা চলো নীতিতে একটি নতুন জোয়ার তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের বক্তৃতা একাধিক বিষয়ে বিশেষ করে রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়ে অনেক আমেরিকানের অনুভূতিকে প্রতিফলিত করেছে। এতে সরকারি নীতিনির্ধারক ও অভিজাতদের প্রতি আমেরিকানদের অবিশ্বাস ও সন্দেহের কথা ফুটে উঠেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, আমেরিকা অনুসৃত বিশ্বব্যবস্থা অন্যান্য দেশকে দেশটির ওপর সুবিধা নিতে সুযোগ দিয়েছে। অনেক ভোটার দেশে টাকা বিনিয়োগ না করে বিদেশে টাকা পাঠাতে পাঠাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন, কারণ অনেক আমেরিকান স্পষ্ট ফলাফলের কোনো নিশ্চয়তা ছাড়া এত রক্ত এবং অর্থ-সম্পদ খরচ করার বিষয়টি আর যৌক্তিক মনে করেনি। ট্রাম্প অন্য দেশগুলোকে নিজ নিজ দেশের সীমান্ত রক্ষায় সাহায্য করার চেয়ে অবৈধ অভিবাসন থেকে মার্কিন সীমান্ত রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। পূর্ববর্তী ডান ও বামপন্থি রাজনীতিবিদদের মতো ট্রাম্পও আমেরিকানদের চাকরির সুযোগ ও নিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে বিশ্বায়নকে চিহ্নিত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবং এখন একজন প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প একলা চলো নীতি বা একতরফাবাদের একটি চরম পন্থা গ্রহণ করেছেন, যা বিচ্ছিন্ন হয়ে বা প্রথাগতভাবে একা চলার নীতি থেকে অনেক আলাদা। তার অবস্থান থেকে তিনি বিভিন্ন দেশ নিয়ে জোট গড়ার গুরুত্ব এবং এমন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা একলা চলো নীতি বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে তার অবস্থান গভীর ও চরমভাবে একতরফা চলার সহজাত প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। ট্রাম্প এবং তার সমর্থকরা বিশ্বাস করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রকে তার স্বার্থরক্ষায় যখন-যেখানে-যেভাবে প্রয়োজন, সেভাবেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নিয়ম, আন্তর্জাতিক আইন বা মিত্রদের উদ্বেগের কারণে পিছপা হওয়া যাবে না।
বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং মার্কিন সীমান্ত রক্ষার জন্য আমেরিকার বিদেশি নীতিকে সীমাবদ্ধ করা উচিত বলে তর্ক করার পরিবর্তে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মার্কিন স্বার্থের তাগিদে বিদেশে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারকে সমর্থন করে এবং উৎসাহ জোগায়। বাম ঘরানার নেতারা যখন বৈশ্বিক কূটনীতি গ্রহণ করার সময় সামরিক শক্তিকে পৃথক রাখা বা দেশেই সীমাবদ্ধ রাখা সমর্থন করে, ঠিক তখন ডান ঘরানার পক্ষ এর বিপরীত পন্থা অবলম্বন করে।
কিছু রিপাবলিকান নেতা এখনো পররাষ্ট্রনীতিতে অধিকতর রক্ষণশীল। চরম পন্থা গ্রহণ করলেও তারা রক্ষণশীল থাকেন। উদাহরণ হিসেবে একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং জাতিসংঘের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালির কথা বলা যায়। তবে যাইহোক, রিপাবলিকান ভোটার বা নির্বাচকমণ্ডলী ক্রমেই আক্রমণাত্মক একতরফা শক্তি প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও সম্ভাবনার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যপন্থা বা মিশ্রণকে সমর্থন করছে বলে মনে হয়।
আফগানিস্তান এবং ইরাকে যুদ্ধের ডামাডোলে রাজনীতিতে বামপন্থিদের অনুসৃত ‘প্রগতিশীল’ নীতি গতি পেয়েছিল। এই প্রগতিশীলতার ভেতরও এককভাবে চলার প্রবণতা ছিল। এ ছাড়া প্রগতিশীলরা বৈদেশিক নীতিতে ডানপন্থিদের অনুরূপ কিছু নীতি অনুসরণ করে। বিশেষ করে বিদেশে কম এবং ঘরে বেশি খরচ করার ওপর জোর দেয়, সেইসঙ্গে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন আমেরিকান কর্মীদের ক্ষতি করেছে, এমন উদ্বেগ অনুভবও প্রকাশ করে।
প্রগতিশীলরা বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতের পেছনে দেশের সম্পদ ব্যয় কমানোর পক্ষে। এর বিপরীতে তারা জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারির মতো বৈশ্বিক সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করার জন্য মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। বাস্তবে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাম ও ডান উভয় ঘরানার রাজনীতিবিদরা একাত্মবাদ বা একলা চলো নীতিকে পরিপূর্ণ সমর্থন করেন না। এর বদলে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণ ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বামপন্থিরা সামরিক বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করে আর ডানপন্থিরা তার বিপরীত অবস্থান সমর্থন করে।
সাম্প্রতিককালে মার্কিন রাজনীতিতে বাম ও ডান—উভয়পক্ষই একাকী চলার মতবাদ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। জনমত জরিপে দেখা যায়, আমেরিকার জনগণের অধিকাংশই পরাক্রমশালী সামরিক শক্তি এবং বিদেশে মার্কিন নেতৃত্ব সমর্থন করলেও বিদেশে মার্কিন সম্পদ ব্যয় ও অন্য দেশে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে অধিকতর সন্দেহপ্রবণ। এমনকি আমেরিকা যখন ঐতিহাসিকভাবে একলা চলো নীতি আলিঙ্গন করেছিল, তখনো আমেরিকার সাধারণ জনগণ সর্বদা বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল। আধুনিক সমস্যাগুলোর বৈশ্বিক মাত্রার পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার একলা চলো নীতির অবলম্বনকারীরাও প্রকৃতপক্ষে সত্যিকারের একলা চলার পথে ডাক দিচ্ছে না।
লেখক: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিবিষয়ক পেশাদার বিশ্লেষক। সম্প্রতি ‘আরব নিউজ’ এর মতামত বিভাগ থেকে নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন মেজর নাসির উদ্দিন আহমেদ (অব.) পিএইচডি।