প্রতিবছরই হজের বিমান ভাড়া বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এ নিয়ে হজ গমনেচ্ছুদের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে হজের বিমান ভাড়া বেড়েছে ৫৮ শতাংশের বেশি।
২০১৭ সালে বিমান ভাড়া ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৩ টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৭ টাকায়। হুহু করে বেড়ে যাওয়া বিমান ভাড়া কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার দাবি উঠেছে। হজযাত্রী নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)’ আগামী বছরের হজে বিমান ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি তুলেছে।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী কালবেলাকে বলেন, ডলার ও ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির কারণেই বিমানের ভাড়া বেড়েছে। বিমান ভাড়া কমানোর বিষয়ে আমাদের চেষ্টা আছে। দেখা যাক কী হয়।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে হজের বিমান ভাড়া ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৩ টাকা। ২০১৮ সালে ১৩ হাজার ৪৬৮ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। ২০১৯ সালে বিমান ভাড়া কিছুটা কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। করোনা মহামারির কারণে পরপর দুই বছর হজ অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২২ সালে সীমিত হজযাত্রী নিয়ে আবারও হজ অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছর হজের বিমান ভাড়া বাড়িয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আর চলতি বছর হজের বিমান ভাড়া ৫৭ হাজার ৭৯৭ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৭ টাকা করা হয়।
প্রতিবছর হজের বিমান ভাড়া বাড়ানোর ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হজের বিমান ভাড়া কমানোর দাবি তোলে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে ভাড়া কমায়নি সরকার। এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ২০২৩ সালের অতিরিক্ত বিমান ভাড়া এবং হজ প্যাকেজের উচ্চ মূল্য নিয়ে হজযাত্রীসহ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালে বিমান ভাড়া ১ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯৭ টাকা নির্ধারণ বাস্তবতার নিরিখে অনেক বেশি ও অযৌক্তিক ছিল। যে কারণে হজ প্যাকেজ ঘোষণার পর সর্বমহলে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি; বরং সমালোচিত হয়েছে। যেহেতু বিমান একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, তাই তাদের একক কর্তৃত্বে ভাড়া নির্ধারণ করা ঠিক হয়নি।
এদিকে আগামী বছর হজের ভাড়া কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে রাখার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছে হাব। এতে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারকে সহযোগিতা করে আসছে হাব। পবিত্র হজের সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতি নিবিড়ভাবে জড়িত। বিষয়টি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভীষণ রকমের স্পর্শকাতরও বটে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২২ সালে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া আগের চেয়ে ১২ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়। মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি এবং করোনার কারণে বিমানের কিছু আসন খালি রেখে ফ্লাইট পরিচালনার যুক্তি দেখিয়ে তখন ভাড়া বাড়ানো হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে হজযাত্রীদের প্রত্যাশা ছিল, করোনা-পরবর্তী বিমান ভাড়া কমবে। কারণ জেট ফুয়েলের মূল্য বাড়েনি। তা ছাড়া সৌদি আরব কোনো নতুন চার্জ আরোপ করেনি। কিন্তু ২০২৩ সালে বিমান ভাড়া আগের বছরের চেয়ে ৫৭ হাজার ৭৯৭ টাকা বৃদ্ধি করা হয়।
সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহবিষয়ক মন্ত্রী ড. তাওফিক বিন ফাওজান আল রাবিয়া সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি বাংলাদেশ ও সৌদিÑউভয় অংশের হজ প্যাকেজের মূল্য কমানোর আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ অংশে হজের খরচের প্রায় সিংহ ভাগই ব্যয় হয় বিমান ভাড়ার পেছনে। তাই হাব ২০২৪ সালের বিমান ভাড়া সহনীয় ও যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের মাধ্যমে হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মন্তব্য করুন