

ভারতের শিল্পগোষ্ঠী আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে পর্যালোচনা কমিটি দুই ধরনের সুপারিশ করেছে। কমিটির একটি অংশ এই চুক্তি বাতিলের পক্ষে হলেও অন্যপক্ষ নতুন করে নেগোশিয়েশনের (দরকষাকষি) পক্ষে মতামত দিয়েছে। পাশাপাশি বিতর্কিত এ আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ চুক্তিতে অনিয়ম খুঁজে পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর রেল ভবনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার কাছে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রধান হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী আদানির চুক্তি নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। অন্যদিকে সম্প্রতি আদানির ঝাড়খন্ডের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ১৫১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের অনুরোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় কমিটির অন্যান্য সদস্য তার সঙ্গে থাকলেও তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ উপদেষ্টাও সাংবাদিকদের কোনো কথা বলতে রাজি হননি। পরে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাউজুল কবির খানের কাছে দাখিল করেছেন। প্রতিবেদনটি বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক পর্যালোচনার জন্য প্রেরণ করা হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ পর্যালোচনান্তে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবে।’
জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি ২০১৭ সালে হওয়া আদানির চুক্তিটি পরীক্ষা করে দেখেছে। পর্যালোচনার পর কমিটি দুই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করে। এর একটিতে এই চুক্তি বাতিল হলে কী কী প্রভাব পড়তে পারে তা এবং অন্যটিতে ফের আদানির সঙ্গে নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্র কোনগুলো এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার উল্লেখ রয়েছে। পর্যালোচনা কমিটি এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) আদানির পাওনা পরিশোধ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আদানি গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থ পেয়েছে। আদানি দাবি করছে, তাদের বকেয়া পাওনা প্রায় ৬০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও পিডিবির হিসাবে এ বকেয়ার পরিমাণ ৩৩৯ মিলিয়ন ডলার। বিষয়টি নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যেকার বিরোধের এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
গত নভেম্বর মাসে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আদানি চুক্তিসহ বেশ কিছু বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে যোগসাজশ ও অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কমিটি।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা বিদ্যুতের কারণে মোট লোকসান ২১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকাই আদানির কারণে। বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও প্রতি মাসে সাড়ে চারশ কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। আদানির বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি খরচ ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা, যা দেশের মধ্যেকার অন্যান্য বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর তুলনায় অনেক বেশি। পিডিবির হিসেব অনুযায়ী, চুক্তির মেয়াদকালে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ৮ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে, যা পদ্মা সেতু নির্মাণ ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
এর আগে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা কমিটির সদস্য আইনবিদ ড. শাহদীন মালিক সর্তক করে বলেছিলেন, বিদেশি কোম্পানি সঙ্গে চুক্তি বাতিল আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে চুক্তি বাতিল করলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (আর্বিট্রেশন) ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানা বা দাবির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
তবে পিডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনি বিরোধ চললেও আসছে গ্রীষ্মে আদানির বিদ্যুৎ নেওয়া অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দেশীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৭ জানুয়ারি আদানির পক্ষ থেকে পিডিবিকে পাঠানো এক চিঠিতে নিয়মিত কার্যক্রম চালু রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ১৫১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মোট বকেয়া ৬০৯ মিলিয়ন ডলার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
২০১৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী, আদানির ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের গোড্ডা প্লান্ট ২৫ বছর ধরে তাদের উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০০ শতাংশ বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ না নিলেও পিডিবিকে মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ (উৎপাদন সক্ষমতা ফি) দিতে হয়।
মন্তব্য করুন