মিঠু দাস জয়, সিলেট
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৩:৩৮ এএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৮:১৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি পাথর উত্তোলন

সিলেটের জৈন্তাপুর
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি পাথর উত্তোলন

প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয় সিলেট জেলা প্রশাসন ও জৈন্তাপুর স্থানীয় প্রশাসন। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদেই চলছে রাংপানি নদী থেকে পাথর উত্তোলন। আর শতকোটি টাকার অবৈধ এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা। উৎসমুখ থেকে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন করায় অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে রাংপানি নদী। যদিও মাঝেমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হয়। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এসব অভিযান লোক দেখানো।

সারা দেশের মতো সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ। তবে গত ৭ জুলাই শ্রীপুর পাথর কোয়ারির জিরো পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট বারকি নৌকা দিয়ে পাথর সংগ্রহ করছেন শ্রমিকরা। সেই পাথর সেলিম চৌধুরীর বাংলো ও খড়মপুর ঘাটে মজুত করে রাখা হচ্ছে। এখানকার মজুত করা পাথর কয়েকটি স্থানে চাঁদা দিয়ে আসামপাড়া (আদর্শগ্রাম), ৪নং বাংলাবাজার ঘাটসহ বিভিন্ন ক্রাশার মিলে পাঠানো হয় বলে কয়েকজন শ্রমিক জানিয়েছেন।

গত এপ্রিলে এভাবে পাথর চুরির সময় হাতেনাতে ধরে ফেলে পুলিশ। এ সময় জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রাজা ও আব্দুল জব্বারকে (বাম্পার জব্বার) আসামি করে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরও বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করে। গত মাসের ২৪ জুন জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের আলাদা দুটি টাস্কফোর্স আসামপাড়া (আদর্শ গ্রাম) ও ৪নং বাংলাবাজার (রাংপানি) এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে পাথর জব্দ করে। পরে পাথরগুলো ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলামের জিম্মায় দিয়ে আসে। সেখান থেকেও পাথর চুরি করে নিয়ে গেছে চক্রটি। খবর পেয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইউপি চেয়ারম্যানকে নোটিশ পাঠিয়ে পাথরগুলোর খোঁজ নিতে বলেছেন।

এর আগে গত ১০ জুন জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাজুল ইসলাম শ্রীপুর, রাংপানি, বাংলাবাজার ও আসামপাড়া এলাকা পরিদর্শন করে পাথর উত্তোলন ও চুরির সত্যতা পান। ১২ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেন তিনি। ২৭ জুন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওসিকে জানান, গুচ্ছগ্রাম এলাকায় পাথর জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেওয়ার পরও পাথর স্থানান্তর হচ্ছে না। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। ২ জুলাই ওসি সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) জানান, পাথর কতটুকু জব্দ করা হয়েছিল, কোনো উল্লেখ নেই। সঠিক তথ্য প্রেরণের অনুরোধ জানান তিনি।

এদিকে কালবেলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে কীভাবে এবং কারা এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। বারকি নৌকার কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রাজা, যুবলীগের আহ্বায়ক শাহীনুর রহমান, যুবলীগ নেতা আব্দুল জব্বার, উপজেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর ছোট ভাই শাহীন আহমদ, সাইফুল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম, মানিক মিয়া, মির্জা রুবেল, টেন্ডল রুবেলসহ আরও কয়েকজন পাথর উত্তোলন ও চুরির নেতৃত্ব দেন। তারা সবাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল আহমদ এবং সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীর অনুসারী।

জানা যায়, পাথরখেকো চক্রের প্রভাবশালী নেতারা প্রশাসনের কাছে সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের নাম ভাঙিয়ে এ সুযোগ নেন। বারকি শ্রমিকরা জানান, রাংপানি উৎস মুখ থেকে পাথর নিয়ে আসতে পুলিশের নামে নৌকাপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা তোলেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জব্বার ও তানভীর। এ পথে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা চলাচল করে।

ট্রাক শ্রমিকরা জানান, শ্রীপুর থেকে পাথরবোঝাই ট্রাক উঠলে ট্রাকপ্রতি ৫০০ টাকা নেন জৈন্তাপুর ট্রাক শ্রমিক উপকমিটির সাধারণ সম্পাদক জামাল আহমদ।

জানতে চাইলে জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক কালবেলাকে বলেন, ‘আপনাকে এ বিষয়ে যে বা যারা বলছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার বিরুদ্ধে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। যে জায়গার কথা বলছেন, ওই জায়গায় আমার বাড়ি। আপনি স্পটে এসে মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।’

জৈন্তাপুর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক শাহীন আহমদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।’ যুবলীগ নেতা আব্দুল জব্বারকে কল দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল আহমদ কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা পাথর কোয়ারি খোলার জন্য আন্দোলনে আছি। আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে এসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে, আমাদের কেউ বলেনি। কেউ অভিযোগ করলে আমি জিজ্ঞেস করতাম। কেউ তো এখন পর্যন্ত অভিযোগ করেনি। কেউ আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে এসব অপরাধে জড়িত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বারকি থেকে টাকা তোলার বিষয় উপজেলা প্রশাসন দেখবে। আমি পাথর-সংশ্লিষ্ট কোনো কমিটিতেও নেই। এগুলো দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের।’

জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী বলেন, ‘একটি চক্র পাথর উত্তোলন করছে, এটি ঠিক। প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিলে ভালো হতো। তবে কয়েকদিন আগে ইউএনও অভিযান করেছেন শুনেছি। কয়েক মাস আগে খড়মপুর বাগানে পাথর উত্তোলন করার দায়ে চক্রটির কয়েকজনের নামে মামলা হয়েছে, তবে মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।’

চক্রটি তার গ্রুপের সদস্য কি না জানতে চাইলে লিয়াকত আলী বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার সবাই আমার পরিচিত। তারা আওয়ামী লীগের লোক। আমার কোনো গ্রুপ নেই বা তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। এলাকার সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট যারা করছে, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি জানিয়েছি। শর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে পরিবেশ সুন্দর হবে কীভাবে?’

সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির শ্রীপুর ক্যাম্প কমান্ডার নায়েব সুবেদার হাবিবুর রহমান বলেন, সীমান্তের জিরো লাইন থেকে পাথর তোলা হচ্ছে না। আমাদের নিয়মিত টহল থাকে। তবে এখানে কিছু পাথর রাখা ছিল, একদিন এসিল্যান্ড এসে সেগুলো জব্দ করেছেন। জিরো লাইনে পাথরখেকো চক্রের নেতাদের পাই না। তাদের পেলে আটক করে মামলা দিয়ে থানায় দিতাম।

চোরাই পাথর নেওয়ার সময় ওসির নামে টাকা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আইনশৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি তুলেছিলাম। তবে আমার নামে যে টাকা ওঠায়, এটা আমার জানা নেই।’

ইউএনও উম্মে সালিক রুমাইয়া কালবেলাকে বলেন, গত দুই সপ্তাহে আমরা আসামপাড়া (আদর্শগ্রাম) ও ৪নং বাংলাবাজার (রাংপানি) এলাকায় দুটি অভিযান পরিচালনা করেছি। পাথরগুলো ইউপি চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের লোক এসে পাথরগুলো নিলাম করবে। তবে খড়মপুর বাগান ঘাট ও সেলিম চৌধুরীর বাংলোয় পাথর মজুদ বিষয়ে জানা নেই। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এএসএম কাসেম বলেন, শ্রীপুর পাথর কোয়ারি সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ আছে। এর পরও কেউ পাথর তুললে ইউএনওকে নির্দেশনা দেওয়া আছে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

জব্দ পাথর জিম্মায় রাখার পর চুরি হচ্ছে, এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। আমি খোঁজ নেব এবং কোনো অনিয়ম হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সিলেট জেলার পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান বলেন, আমি এগুলো নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনছি। আমি নতুন এসেছি। এগুলো নিয়ে বসব, খোঁজ নেব এবং জেলা প্রশাসনকে নিয়ে শক্তভাবে ব্যবস্থা নেব।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডিজিটাল মোবাইল জার্নালিজম ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে : উমামা ফাতেমা 

গাজায় ভয়াবহ ক্ষুধা, মানবিক সুনামির আশঙ্কা

চট্টগ্রাম রেলস্টেশন : স্ক্যানার আছে, ব্যবহার জানা নেই

নতুন যুদ্ধের সতর্কবার্তা ইরানের, ঘরে ঘরে প্রস্তুতির আহ্বান

চাকরি দিচ্ছে ব্যাংক এশিয়া, চলছে অনলাইনে আবেদন

ছোট্ট তিলেই লুকিয়ে থাকে ক্যানসার বীজ? যা বলছেন চিকিৎসক

শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

স্কুল ব্যাগে মিলল ৭ লাখ টাকার জালনোট, গ্রেপ্তার ১

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

জুমার দিন মসজিদে এসে যে ৩ কাজ ভুলেও করবেন না

১০

২৯ আগস্ট : আজকের নামাজের সময়সূচি

১১

যারা অত্যাচার-নির্যাতন করেছে তাদের বিচার হতেই হবে : হুম্মাম কাদের

১২

স্বাস্থ্য পরামর্শ / চোখের লাল-জ্বালা: এডেনোভাইরাল কনজাঙ্কটিভাইটিসের প্রাদুর্ভাব

১৩

ইতালিতে ‘ও লেভেল’ পরীক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সাফল্য

১৪

সাবেক এমপি বুলবুলের পিএস সিকদার লিটন গ্রেপ্তার

১৫

টাকা না পেয়ে ফুপুকে গলাকেটে হত্যা করল ভাতিজা

১৬

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য বিশেষ কোটা বাতিল 

১৭

আন্তর্জাতিক ফেলোশিপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ছাত্রদলের ঊর্মি

১৮

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরেছেন খালেদা জিয়া

১৯

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারের মায়ের মৃত্যুতে প্রেস ক্লাবের শোক

২০
X