জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত, নবজাতকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত এবং সুস্থভাবে বেড়া ওঠায় মায়ের দুধের বিকল্প নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, অর্ধেকেরও কাছাকাছি চিকিৎসক সরাসরি যুক্ত শিশুখাদ্য বিপণন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী ও হাসপাতাল থেকেও মায়েদের পরামর্শ দেওয়া হয় শিশুকে মায়ের দুধ পান না করানোর। এমন অনৈতিক চর্চায় বাড়ছে পুষ্টিহীনতা। কমছে মাতৃদুগ্ধ পানের হার। এসব নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ নেই বলেও জানা যায় গবেষণা প্রতিবেদন থেকে।
ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাসিসট্যান্স ফর হেলথ এবং নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ডা. রুকসানা হায়দার সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত সর্বশেষ গবেষণা উপস্থানকালে এসব তথ্য জানান। তিনি আরও বলেন, দেশে প্রসব পরবর্তী সময়ে ৫৭ শতাংশ মাকে স্বাস্থ্যকর্মীরা পরামর্শ দেন শিশুকে ফর্মুলা খাওয়ানোর। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশ মা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শমতো নির্ধারিত ব্র্যান্ডের ফর্মুলা পান করান। আবার ২১ শতাংশ শিশুখাদ্যের ব্র্যান্ড নির্ধারণ করে দেয় মাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই। গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ শতাংশ চিকিৎসক সরাসরি ফর্মুলা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত।
দেশের সর্বশেষ স্বাস্থ্য ও জনমিতি জরিপের (২০২২) ফলেও যার প্রমাণ মেলে। সেখানে বলা হয়েছে, শূন্য থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুর মায়ের দুধ পানের হার ৬৫ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশে নেমেছে। আর ছয় থেকে ২৪ মাস বয়সী শিশুদের শতকরা ৪০ ভাগই অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়।
জানা যায়, গত কয়েক বছর আগেও দেশে কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ নারী সন্তানের পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ পান করাতেন, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। কিন্তু চিকিৎসক ও ফর্মুলা কোম্পানির যোগসাজশে সে হার কমছে। উদ্বিগ্নজনকভাবে বাড়ছে শিশু খাদ্যের বাজার। বাংলাদেশে এ বাজার এখন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪২৭ দশমিক ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৯,০২৫.১১ টন শিশুর খাদ্য আমদানি করা হয়। যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকায় ৮,০৬৫.৬৬ টন; ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৮২০ কোটি টাকার ৭,৮২৫.১১ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮৮ কোটি ৪১ লাখ টাকায় ২,৪৪৭.১৬ টন বিকল্প শিশু খাদ্য আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি) ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) পুষ্টিবিষয়ক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যথাযথ পুষ্টির অভাবে দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৮ শতাংশ খর্বাকৃতি, ১০ শতাংশ কৃশকায় এবং ২৩ শতাংশ বয়স অনুপাতে কম ওজন সমস্যায় ভুগছে। সমস্যাগুলোর প্রধান কারণ গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব এবং জন্মের পর প্রয়োজনীয় মায়ের বুকের দুধ পান না করা।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ গোলাম নবী বলেন, দেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত বিকল্প শিশুখাদ্যের বিক্রি ও বিপণন সংক্রান্ত আইন রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রণীত আইনটির ২০১৭ সালে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। তবে সেটির বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে শিশুখাদ্যের বিক্রি বেড়েছে, কমেছে মায়ের দুধ পানের হার। সম্প্রতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ১৭টি প্রতিষ্ঠান আরও ৯৮টি প্যাকেটজাত বিকল্প শিশুখাদ্যর অনুমোদন চেয়েছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সব অনুমোদন পায়নি।
আইন অনুযায়ী, মায়ের বুকের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য ও বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত শিশুর বাড়তি খাদ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও শাস্তির আওতায় আনা যাবে। আর এসব খাদ্য বা সরঞ্জামাদি ব্যবহারে কোনো শিশু অসুস্থ বা মৃত্যু হলে প্রস্তুতকারির ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান আছে।
এ বিষয়ে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প ও শিশু খাদ্যপণ্য নিবন্ধন যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ডা. মুরাদ মো. সমশের তবরিছ খান বলেন, কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপণন নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত না হয়ে শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে মায়েদের অনুরোধ জানান তিনি।
মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য উৎপাদন বা আমদানিতে ৪টি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে আইনে উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে পণ্যের অনুমোদন দেওয়া হয়। শিশুর জন্য প্রস্তুত করা খাদ্য ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম তেজস্ক্রিয়তা মুক্ত কি না। উৎপাদনকারী দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা সনদ আছে কি না। সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) সনদ ও নিবন্ধন রয়েছে কি না। সবশেষে, কোডেক এলিমেন্টারিয়াস কমিশনের সনদ আছে কি না।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ গোলাম নবী বলেন, দেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান মায়ের বুকের দুধের বিকল্প ও শিশুখাদ্য বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত ও আমদানি করে। যেখানে প্রচলিত আইনের ব্যত্যয় ঘটে। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান তাদের আইনে আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ক আইন ও বিধি ভ্রাম্যমাণ আদালতে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় সরাসরি শাস্তি দেওয়া যায় না। আইনটি ভ্রাম্যমাণ আদালতে অন্তর্ভুক্তি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। যাতে আইন অমান্যকারীদের সরাসরি শাস্তির আওতায় আনা যায়।