রাজন ভট্টাচার্য
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৩, ০১:৪১ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩, ০৮:২৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন

ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে বড় বিপর্যয়

ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে বড় বিপর্যয়

অতি তাপদাহের কারণে কিছুদিন আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এবারের ঘটনা ঠিক বিপরীত। বানের পানিতে বাঁকা হলো রেললাইন। নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহনী এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লাইন।

কেন এই ঘটনা? যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনায় ভুল, নকশায় ত্রুটি প্রকল্পের প্রধান সমস্যা। দেশের অন্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক পানির প্রবাহ উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে থাকে। কিন্তু এই অঞ্চলের পানির স্রোত ও পাহাড়ি ঢল পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী। ঢাল থেকে পানিপ্রবাহ পূর্ব-পশ্চিমে যাওয়ায় সুযোগ পায়নি। রেললাইন আড়াআড়িভাবে থাকায় প্রবল পানির চাপে মাটি ও পথর সরে গিয়ে লাইন বাঁকা হয়ে যায়। জোড়াতালির মেরামত করা হলে ভবিষ্যতে এরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেখা দিতে পারে বড় বিপর্যয়।

প্রাথমিকভাবে এক থেকে দেড় কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান। গত সোমবার তিনি কালবেলাকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে মেরামত শেষে প্রকল্প আোদের বুঝিয়ে দেবে। বৃষ্টি না হলে আগামী এক থেকে দেড় মাস হয়তো মেরামতে সময় লাগবে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পে পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল ও উদ্বোধন করা হবে বলেও জানান তিনি।

পরিকল্পনায় ভুল ও নকশায় ত্রুটি প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, সমীক্ষার চেয়ে বেশি কালভার্ট ও সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর তো কারও হাত নেই। তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় প্রকল্পে ভুল হয়ে গেলে তাকে টেকসই উন্নয়ন বলে না। টেকসই উন্নয়ন হলো কোনো প্রকল্প নির্মাণে ৭৫-১০০ বছর পর্যন্ত সুবিধা পাওয়া। এই প্রকল্পে ত্রুটির কারণে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় রকমের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সংকট সমাধানে জোড়াতালির সংস্কার না করে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাগুলোতে কালভার্ট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বর্তমানে চট্টগ্রামের দোহাজারী পর্যন্ত রেললাইন রয়েছে। সেখান থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০১ কিলোমিটার নতুন সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ করা হচ্ছে। তাতে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপন হবে। আগামী বছরের জুনে শেষ হতে যাওয়া এ প্রকল্পে খরচ হচ্ছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকার বেশি। আগামী সেপ্টেম্বরে এ লাইনে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু করতে চায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি প্রায় ১১ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণকাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে।

এর আগে ২০২১ সালের আগস্টে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় রেলপথের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারমুখী নির্মীয়মাণ রেলপথের প্রায় ১০ কিলোমিটার। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে রেললাইনের পাথর ও মাটি সরে গেছে। কিছু জায়গায় রেললাইনও সরে গেছে।

চট্টগ্রামের দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মীয়মাণ ১০০ কিলোমিটার রেলপথের প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ পড়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। পুরো রেলপথের মধ্যে এই অঞ্চল তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু। ফলে কিছু জায়গায় মাটি থেকে ২০ ফুট উঁচুতে রেলপথের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান কালবেলাকে বলেন, প্রকল্পের ১০০ কিলোমিটার পথে দু-তিন কিলোমিটার ক্ষতি হয়েছে। রেলের বাঁধের জন্য আগে বা এখন বন্যা হয়েছে, এটাও ঠিক নয়। বাঁধের দুই পাশেই পানি সমান ছিল। ফলে বাঁধের কারণে পানিপ্রবাহে সমস্যা হয়েছে বলা যাবে না।

কামরুল আহসান বলেন, রেললাইন বেঁকে গেছে, ভুলভাবে এমনটা বলা হচ্ছে। আসলে সব জায়গায় এখনো জয়েনিং ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শেষ হয়নি। তাই কিছু জায়গায় ডিসপ্লেস হয়েছে। এটিকে বেঁকে যাওয়া বলে না। এরই মধ্যে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ চূড়ান্ত করছেন বলেও জানান তিনি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক কালবেলাকে বলেন, দেশের অন্য জায়গায় পানির প্রবাহ উত্তর-দক্ষিণমুখী হলেও এখানে পূর্ব-পশ্চিমমুখী। এ জন্য রেলপথ খুঁটির ওপর করা জরুরি ছিল। ওই অঞ্চলে কোনো প্রকল্পই বাঁধনির্ভর করা ঠিক হবে না। এই অঞ্চলের জন্য বাঁধ একটি বড় সমস্যা।

তিনি বলেন, এখন পরিষ্কার হয়েছে প্রকল্প পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল। পরিকল্পনা কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে নামমাত্র একটি সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ভালোভাবে স্টাডি করা হলে তখনই ভবিষ্যৎ সমস্যা চিহ্নিত করা যেত।

প্রকল্পে কর্মরত প্রকৌশলী আবদুল জব্বার মিলন জানান, প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে তিনটি ছোট-বড় সেতু আছে, যা দেশের অন্য কোথাও নেই। এ জন্য কালভার্ট অপর্যাপ্ত, এটা বলা যাবে না।

সর্বশেষ জুলাইয়ের প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১০০ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ৮৮ কিলোমিটার লাইন বসানো হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ৮৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান কালবেলাকে বলেন, নকশা ও পরিকল্পনায় বেশ ত্রুটি থাকায় ভবিষ্যতে এরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রকল্পটি আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, প্রতি মিটার রেললাইনের ৯০-১১১ পাউন্ড ওজন। পানির চাপে নিচে ও উপরের মাটি-পাথর সরে যাওয়ায় লাইন বাঁকা হয়ে যায়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভেড়ামারায় সাপের কামড়ে স্বামীর মৃত্যুতে পাগলপ্রায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী

থানায় সেবা নিতে এসে কেউ যেন কষ্ট না পায়: আইজিপি

মাইক্রোবাসে আগুন, প্রাণে বাঁচলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরা

তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ময়মনসিংহে আবারও ট্রেন লাইনচ্যুত

চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত

২৫টি এয়ারক্রাফট দিয়ে ২০টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

প্রথম ফিউচারনেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬ 

শিক্ষক সংকটে মান হারাচ্ছে তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

সুরে সুরে মোহাম্মদ রফিকে স্মরণ

আমরা যুদ্ধকে স্বাগত জানাইনি এবং কখনোই জানাব না: ইরানের স্পিকার

১০

সকালের মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে

১১

যারা মনে করেন ইরানের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব নয়, তাদের এমন অবস্থানে হতাশ ভান্স

১২

বন্দর আব্বাসে নতুন করে মার্কিন হামলা, দাবি সেন্টকমের

১৩

ফাইনালে কি নিষিদ্ধ হতে পারেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা, ফিফার নিয়ম কী বলছে?

১৪

বদিউর রহমান আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান সেলিম রহমান

১৫

মৌলভীবাজারে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত

১৬

বান্দরবানে রথযাত্রা উদযাপন

১৭

নবাবগঞ্জে রথযাত্রা উদযাপিত

১৮

নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেলেন খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম

১৯

সাবেক ইংল্যান্ড তারকাকে ‘মূর্খ’ বললেন রোমেরো

২০
X