

চলমান মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে রাজশাহী বিভাগজুড়ে সরকারি হাসপাতালে বেড়েছে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও মৌসুমি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসক-নার্সসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (০৭ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় নওগাঁর বদলগাছিতে চলতি মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে রাজশাহীতে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে মঙ্গলবার (০৬ জানুয়ারি) রাজশাহীতে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি রেকর্ড করেছে রাজশাহী আবহাওয়া অফিস।
জানতে চাইলে রাজশাহী আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে হালকা, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রিকে মাঝারি এবং ৬ ডিগ্রির নিচে নামলে সেটিকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়। রাজশাহীতে বর্তমানে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ চলছে, যা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, গত সপ্তাহ থেকে তাপমাত্রা কমে যাওয়া, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসের কারণে প্রতিদিনই ঠান্ডাজনিত জটিলতায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীর চাপ বাড়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল বর্তমানে চরম জনাকীর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ১ হাজার ২০০ হলেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২ হাজার ৫৩৭ জন। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ করা হলেও জনবল বাড়ানো হয়নি। এতে সেবা কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ঠান্ডাজনিত কারণে আসা রোগীর অধিকাংশই শিশু ও বয়স্ক। প্রতিদিনই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু ও শ্বাসকষ্টে ভোগা বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ায় রোগ জটিল হয়ে উঠছে।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার নাজিপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মো. স্বাধীন জানান, তার অসুস্থ মাকে ভর্তি করানো হলেও শয্যা না পেয়ে ৩৩নং ওয়ার্ডের সিঁড়ির পাশে থাকতে হচ্ছে। নিরূপায় হয়ে এভাবেই চিকিৎসা গ্রহণ করতে হচ্ছে।
এদিকে রামেকের শিশু বিভাগে শয্যা সংকট আরও প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়ার্ডের ৫৩টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ১৪৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন আছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শহীদা ইয়াসমিন জানান, ভর্তি হওয়া শিশুদের বেশিরভাগই সর্দি, ব্রঙ্কিওলাইটিস, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বিভাগের বগুড়া, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাসপাতালগুলোতেও। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. মো. নজমুল হক জানান, ৫০০ শয্যার হাসপাতালে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০'র বেশি রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। বাধ্য হয়ে অনেককে হাসপাতালের মেঝেতে রাখতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে বর্তমানে ৩৫০ থেকে ৩৭৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতাল আপগ্রেড হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নেই। মাত্র ৫০ শতাংশ জনবল দিয়ে সেবা চালাতে হচ্ছে।
নওগাঁ সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মো. মীর সুফিয়ান জানান, ১০০ শয্যার বিপরীতে সেখানে বর্তমানে ২২২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। শিশুদের পাশাপাশি ডায়াবেটিসজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শৈত্যপ্রবাহ দীর্ঘ হলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তারা নিম্নআয়ের মানুষ, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমিক ও গ্রামীণ বাসিন্দাদের গরম কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান ও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন