

ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন রাজবাড়ীর সমির মণ্ডল ও গোপালগঞ্জের জয়ন্তী বিশ্বাস। বিয়ের ৯ বছর পর এ দম্পতির ঘর আলোকিত করে আসে মেয়ে প্রতিভা মণ্ডল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জন্ম নেওয়া মেয়েকে নিয়ে এ দম্পতির স্বপ্ন ছিল সীমাহীন। এর মধ্যে আরও এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয় এ দম্পতির সংসারে।
সমির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন। রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগ স্টাফ কোয়ার্টারে ৩ বছরের প্রতিভা মণ্ডল ও ছয় মাস বয়সী জানভি মণ্ডলকে নিয়েই ছিল তাদের ছোট্ট সংসার। তবে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে তছনছ হয়ে গেছে তাদের সেই সাজানো সুখের সংসার।
সমির মণ্ডল জানান, প্রথমে জয়ন্তীর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। কয়েকদিন পর মেয়ে প্রতিভাও মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়। প্রথমে বাসায় থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছিলেন তারা। অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গত ২১ সেপ্টেম্বর ভোরে মৃত্যু হয় জয়ন্তী বিশ্বাসের। মায়ের মৃত্যুর এক দিন পর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রতিভাও মারা যায়। নিমেষেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় সাজানো সংসারটি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সমির বলেন, ‘২০১৩ সালে জয়ন্তীকে ভালোবেসে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের দীর্ঘ ৯ বছরেও আমাদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। অনেক চিকিৎসার পর ২০২২ সালের ১১ জুন মেয়ে প্রতিভার জন্ম হয়। আমার স্ত্রীর স্বপ্ন ছিল প্রতিভাকে ডাক্তার বানাবে। আমাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। আমার ছোট মেয়েটার বয়স এখন ৬ মাস চলছে। সে-ও এই বয়সে মা-হারা হলো। আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’
তিনি বলেন, ‘গত ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টার দিকে চিকিৎসকরা লাইফ সাপোর্ট খুলে দিয়ে জয়ন্তী বিশ্বাসকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ঢাকা থেকে গাড়িতে করে লাশ রোববার বিকেলেই আমাদের গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে নেওয়া হয়। স্ত্রীকে সমাধি করে ওই গাড়ি নিয়েই রাত ১১টার দিকে ঢাকায় মেয়ের কাছে পৌঁছাই। ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন রাত ৯টার দিকে আমার অনেক আদরের মেয়ে প্রতিভা মণ্ডলও মারা যায়। আবার ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে মেয়ে প্রতিভা মণ্ডলের লাশ নিয়ে আসি গ্রামের বাড়ি। মায়ের পাশেই আদরের মেয়ের নিথর দেহটি সমাধি করা হয়।’
জয়ন্তী ও প্রতিভার মতো চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে ১৮৮ জনের। তবে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। অবশ্য এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১৯ জন। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে ৪৪ হাজার ৬৯২ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ২৫৫ জন। এ নিয়ে ৪২ হাজার ৪৭৮ রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বড় কারণ শক সিন্ড্রোম। মোট মৃত্যুর ৫৬ শতাংশ ঘটেছে শক সিন্ড্রোমে। মৃতদের ৪০ শতাংশ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। মৃতদের মধ্যে ১৯ জন ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী। শূন্য থেকে ১০ বছর বয়সীর সংখ্যা ১৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, জুলাই থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে থাকে। সেপ্টেম্বরে প্রকোপ থাকে সবচেয়ে বেশি। রোগটি মোকাবিলায় আমাদের ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি নেই। ডেঙ্গুতে নতুন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শনাক্তকরণ কিট, ওষুধ কিংবা স্যালাইনের কোনো সংকট নেই।
তিনি বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য টিম গঠন করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে দেশে মোট ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জনের এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে মারা যান সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।