

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পেশাগত পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা। কোথাও অধ্যক্ষকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বের করে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও প্রধান শিক্ষকের হাত-পা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার মব তৈরি করে কলেজে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিনের অধ্যক্ষকে। এসব ঘটনার মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়োগ ও অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও পেশাদারিত্বের ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে।
অধ্যক্ষকে ধাক্কা দিয়ে বের করা হলো: কালবেলার ময়মনসিংহ ব্যুরো জানিয়েছে, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভুটিয়ারকোনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদকে লাঞ্ছিত করে প্রতিষ্ঠানের বাইরে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, ধেরুয়া কড়েহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন তাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বের করছেন। এ ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
অধ্যক্ষ গোলাম মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে কলেজের কিছু শিক্ষক ও স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পক্ষ তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল, এমনকি ৫০ লাখ টাকা চাঁদাও দাবি করা হয়। একাধিকবার বহিরাগতদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে বের করে দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকজন এসে তাকে জোর করে বের করে দেয়। এ ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগে আগে থেকেই আন্দোলন চলছিল। ৫ আগস্টের পর তাকে সরিয়ে দিয়ে অন্য শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করা হয়, পরে আবার দায়িত্ব ফিরে পান তিনি। কিন্তু স্থানীয় একটি পক্ষ তার কলেজে প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছিল।
ওই দিন কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বের করে দেওয়া আনোয়ার হোসেন ফোন ধরেননি। অন্যদিকে, জামায়াত নেতা ওয়ালি উল্লাহ বলেছেন, অধ্যক্ষকে কলেজে যেতে বলা হলেও তিনি নিজেই পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছেন।
শিক্ষক সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘এটা একজন শিক্ষকের সঙ্গে ঘৃণিত আচরণ। যারা করেছে, তাদের বিচার হওয়া উচিত।’ গৌরীপুর থানার ওসি দিদারুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দুই পা ভেঙে দেওয়া হলো: কালবেলার পিরোজপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পিরোজপুরের জুজখোলা সম্মিলিত বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপুল মিত্রর (৫০) ওপর দুর্বৃত্তরা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তার দুই পা ও এক হাত ভেঙে দিয়েছে। তার সঙ্গে থাকা সহকারী শিক্ষক অসীম কুমারকেও পিটিয়ে আহত করা হয়।
এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান চানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে স্থানীয় দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব থেকে হামলার সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিকেলে বিদ্যালয় শেষে শহরে ফেরার পথে ৭–৮ জন মুখোশধারী দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে তাদের ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় বিপুল মিত্রকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে মামলা হওয়ার পর শুক্রবার ভোরে কামরুজ্জামান চানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মব সৃষ্টি করে অধ্যক্ষকে কলেজে প্রবেশে বাধা: বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নাটোরের জোনাইল ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আবুল আছর মো. শফিউজামান অভিযোগ করেছেন, তাকে কলেজে প্রবেশ করতে বাধা দিয়ে তার কক্ষে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উপাধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম ও কিছু শিক্ষক এবং বহিরাগতদের সহায়তায় এ মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। কলেজ ফান্ড থেকে টাকা দাবি, নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজিসহ একাধিক অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাকে টার্গেট করা হয়েছে।
অধ্যক্ষ জানান, এই দ্বন্দ্ব থেকে অ্যাডহক কমিটি গঠন নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। তাকে ছয় মাসের বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়ে এস এম রাজিবুল করিমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়, পরবর্তী সময়ে ছুটি বাড়ানো হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এখনকার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ফান্ডে দুর্নীতি, শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় ও অবৈধ নিয়োগের চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম রাজিবুল করিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়ম মেনে কাজ করছি।’ বডির সভাপতি চান্নু মিয়াও অধ্যক্ষের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।