

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লাগা আগুনে পুড়েছে দেড় সহস্রাধিক ঘর। আগুনের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসা কড়াইল বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দাই আবার পোড়া বস্তিতে গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। পোড়া ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে মেঝেতেই মাথা গুঁজছেন তারা। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর বস্তিতে বসবাস উপযোগী পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা বেড়ে যাওয়ায় শীতেও কষ্ট পাচ্ছেন অনেকে, বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরাই এক্ষেত্রে ভুগছেন বেশি। এ ছাড়া দলীয় ও ব্যক্তি উদ্যোগে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ তেমন নেই, পাশাপাশি শৌচাগার নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকে বস্তির দুপাশে বসানো মেডিকেল ক্যাম্পে নারী-শিশুর ভিড়। দুটি বুথে ৫ শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নেন। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে আসেন। মেডিকেল বুথগুলোর কর্মীরা জানান, এর বাইরে চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ঠান্ডাজনিত সমস্যায় সেবা নিয়েছে। বাকিরা মালপত্র সরাতে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়েছে। ঠান্ডাজনিত সমস্যায় বেশি পড়েছে শিশুরা। তার পরই আছেন বৃদ্ধ ও মধ্যবয়সীরা।
মেডিকেল ক্যাম্প থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা বস্তির বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী হোসনে আরা বেগম জানান, তিনি পরিবারসহ বস্তির উন্নয়ন ক্লাবের সামনে একটি দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। আগুনে পুরো ঘর পুড়ে যাওয়ায় তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি দোকানের মেঝেতে। পাতলা একটি কাপড় বিছিয়ে রাতযাপন করার পর সকালে তার নাতি-নাতনি ও তার নিজের ঠান্ডা লেগেছে। নাক বন্ধ হয়ে গেছে। শিশুদের গলায় ব্যথা আছে।
নূর আলম নামে এক যুবক বলেন, ‘রাতে সিমেন্টের বস্তা বিছিয়ে ঘুমাইছি। বাচ্চাদের সবার ঠান্ডা লেগেছে। আমার পুরো শরীরে ব্যথা। মেডিকেল ক্যাম্প থেকে ওষুধ নিয়ে আসছি।’
এদিকে আগুনের পর বস্তিতে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শৌচাগারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আগুনের পর বুধবার থেকে দলীয় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাবার নিয়ে আসছে অনেকে। কিন্তু সেই তুলনায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া আগুনে ঘরের সঙ্গে শৌচাগারগুলোও পুড়ে গেছে।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকটি এনজিও প্রতিষ্ঠান ছোট ছোট বোতলজাত পানি নিয়ে আসে। তবে তা ছিল চাহিদার তুলনায় সামান্য। মুহূর্তেই সব পানি শেষ হয়ে যায়। এ
ছাড়া ওয়াসার গাড়িতে পানি আনা হলেও তাও পর্যাপ্ত ছিল না।
নাজমা বেগম নামের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘আগুনের পর অনেকে খাবার নিয়ে এলেও খাবার পানি তেমন পাইনি। আমাদের খাবার পানি প্রয়োজন। টয়লেট নিয়ে সমস্যার শেষ নেই।’
তহুরা বেগম নামের আরেকজন জানান, ‘বুধবার বিকেল থেকে অনেকে খিচুড়ি, তেহারি ও মুড়ি নিয়ে আসছে। একটা খাবার দুবার খেতে হয়েছে। পানি ও টয়লেটের খুব সমস্যা হচ্ছে।’
আগুনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হলেও সরকারি পর্যায় থেকে কোনো অর্থ সহায়তা আসেনি বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। সরকারের কর্তাব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও দুদিনে কোনো অর্থ সহায়তা আসেনি।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত শাহিন আলম বলেন, ২০ বছর ধরে এ বস্তিতেই আছি। অন্য কোথাও থাকার সামর্থ্য নেই। অনেকে সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছেন, কিন্তু আমাদের আর্থিক সহায়তা দরকার।
কড়াইল বস্তিতে ২৫ বছর ধরে বসবাস করছেন তানভীর হাসান নামে এক ব্যক্তি। তার একটি ছোট মুদি দোকান, যা দিয়ে চলত চারজনের সংসার, আগুনে সেটিও পুড়ে ছাই। তিনি বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা আশ্বাস দিচ্ছেন, পাশে থাকবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদৌ পাশে পাব কি না সন্দেহ হচ্ছে। সবাই শুধু নাম লিখে যাচ্ছে, বলে যাচ্ছে সহযোগিতা করবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ করেনি। কবে পাবো সহযোগিতা?
মন্তব্য করুন