‘তোকে একেবারে খুন করে ফেলব। তুই মানুষ চিনিস? আমাকে চিনস না, আমি কিডা?’
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) সহকারী রেজিস্ট্রার (শারীরিক শিক্ষা দপ্তর) মো. শেখ শাহজামালকে এভাবেই শাসাচ্ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমাছুর রহমান অয়ন।
ব্যাডমিন্টন খেলার দুই বক্স ফেদার চেয়ে ওই কর্মকর্তাকে ফোন করেছিলেন অয়ন। না পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাফাত বিন ইসলাম শোভনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী তার দপ্তরে হানা দেন। তারা প্রথমে শাহজামালকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। এরপর দেন সরাসরি হত্যার হুমকি। সেখানেই শেষ নয়, এক পর্যায়ে ওই কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলেন শোভন, অয়ন ও তাদের কর্মী লিখন। সঙ্গে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল সাংগঠনিক সম্পাদক জহির রায়হানসহ ছাত্রলীগের ১৫ থেকে ১৮ জন নেতাকর্মী। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বাবুর অনুসারী। ক্যাম্পাসজুড়ে তাদের পরিচিতি ‘বাবু গ্রুপ’।
গত রোববার দুপুর দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের শারীরিক শিক্ষা দপ্তরে এ ঘটনা ঘটে। কালবেলার হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ডে পুরো ঘটনাটি শোনা যায়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কর্মকর্তা শাহজামাল ওইদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘রোববার দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে একটি নম্বর থেকে তার ফোনে কল আসে। তিনি তখন ট্রেজারার অফিসে ছিলেন। সেখান থেকে অয়ন, শোভন, লিখন, জহির, শান্তসহ ১৫ থেকে ১৮ জন ছেলে তাকে শারীরিক শিক্ষা দপ্তরে ডেকে এনে হেনস্তা করে হত্যার হুমকিসহ শারীরিকভাবে আঘাত করেন। এ সময় তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য বলেন, না গেলে খুন করে ফেলার হুমকি দেন।’
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা শাহজামাল বলেন, ‘তারা দুপুরে এসে আমার কাছে ফেদার কেনার জন্য টাকা চান; কিন্তু আমি বলেছি লিখিত আবেদন করতে। তারা সেটি করতে রাজি হননি; বরং তারা আমাকে তাৎক্ষণিক টাকা দিতে বলেন। এতে অপারগতা প্রকাশ করলে তারা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। এরপর আমার শার্টের কলার চেপে আমাকে বের করে নিতে চান। আমাকে আমার চেয়ার থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। এক পর্যায়ে অয়ন আমাকে খুন করে ফেলার হুমকি দেন। এ নিয়ে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি প্রশাসনের কাছে আমার নিরাপত্তা এবং আমাকে হত্যার হুমকির বিচার চাই।’
জানা গেছে, এর আগে গত বছরের ৪ এপ্রিল চাঁদা না দেওয়ায় মাসুদ রানা সরকার, মিনহাজুল ইসলাম প্রান্তসহ ছাত্রলীগের ১০ থেকে ১৫ কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা শেখ শাহজামালকে তার অফিসে আটকে রেখে লাঞ্ছিত করেন। সে সময় তিনি লিখিতভাবে অভিযোগ করেছিলেন। কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বাবু কালবেলাকে বলেন, ‘ওই কর্মকর্তার (শাহজামাল) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীরই ভালো সম্পর্ক নেই। উনি ফেদার কিনে দেওয়ার কথা বলেও দেননি।’
এ কারণে কারও গায়ে হাত দেওয়া যায় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাবু বলেন, তারা গায়ে হাত দেয়নি। অডিওতে গায়ে হাত দেওয়ার প্রমাণ পাইনি। তবে সে (ভুক্তভোগী) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর অভিযোগ দিয়েছে। কেউ অপরাধ করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’
এই অভিযোগের বিষয়ে পাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম বলেন, ‘আমি শুনেছি একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। আমি হাতে পাইনি। হাতে পেলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কামাল হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘এই ধরনের একটি ঘটনার কথা শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন বলেন, এই মুহূর্তে আমি পাবনায় নেই। ক্যাম্পাসে গিয়ে জানা যাবে। বিষয়টি শুনেছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবিপ্রবিতে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে ‘বাবু গ্রুপ’। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলে নিয়ে নির্যাতন করে চাঁদা আদায়, প্রকল্প থেকে চাঁদা আদায়, চাঁদার জন্য কর্মকর্তাকে রুমে আটকে রাখা, বিশ্ববিদ্যালয় গেটে চাঁদাবাজি এবং বাকি না দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের হোটেল ব্যবসায়ীদের মারধর। আর যখন তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হাত তোলার ঘটনা তো আছেই। এই গ্রুপের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও প্রায় জিম্মি।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, বাবু গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে আছেন মাসুদ রানা সরকার (গণিত অষ্টম ব্যাচ), মিনহাজুল ইসলাম প্রান্ত (সমাজকর্ম বিভাগ অষ্টম ব্যাচ), সাগর হোসেন (বাংলা বিভাগ অষ্টম ব্যাচ), তৌফিক হাসান হৃদয় (বিবিএ বিভাগ দশম ব্যাচ), সুরুজ মিয়া আপেল (গণিত বিভাগ দশম ব্যাচ) ও জহরুল ইসলাম পিয়াস (অর্থনীতি বিভাগ দশম ব্যাচ)।
জানা গেছে, গত বছরের ৪ এপ্রিল তিন সাধারণ শিক্ষার্থীকে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়। তারা হলেন লোকপ্রশাসনের জয়, ইইর আব্দুল আজিজ ও ইংরেজি বিভাগের আসাদুল ইসলাম। গত বছরের ১৬ মে রাকিবুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীকে হলে আটকে রেখে শিবির হিসেবে চিহ্নিত করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠে ওই গ্রুপের বিরুদ্ধে। মারধরের এক পর্যায়ের রাকিব তার বাবাকে ফোন করে ৩০ হাজার টাকা এনে দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৫ এপ্রিল সকালে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউআরপি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শাওনকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ১২৭ নম্বর কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। একইভাবে স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মুনকে ডেকে নিয়ে একই কক্ষে বন্দি করে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এক পর্যায়ে মুন বাসায় গিয়ে টাকা পাঠানোর অঙ্গীকার করলে তাকে এবং শাওনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাতের ১ লাখ টাকা দামের ল্যাপটপ নিয়ে যান ছাত্রলীগ কর্মীরা।
ওই ঘটনার পাঁচ দিন পরে ১০ এপ্রিল সমাজকর্ম বিভাগের নবম ব্যাচের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানকে রাত ১২টার সময় পাবনা শহরের মোজাহিদ ক্লাবের মেস থেকে তুলে আনা হয়। রাতভর নির্যাতনের পর সকালে নগদ ২৫ হাজার টাকা এবং ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন রেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গত ৬ মে সকাল ১১টায় সিএসই দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ ইবনে নূরকে ক্লাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে নিয়ে যাওয়া হয়। ২১২ নম্বর কক্ষে আটকে রেখে ‘শিবির’ স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে টাকা দাবি করে তার গলায় চাকু ধরা হয়। সন্ধ্যায় নূরের বাবা বিকাশ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা পাঠালে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বেধড়ক পেটায় এ গ্রুপের সদস্যরা।।
বাবু গ্রুপ মতোই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল্লাহর বিরুদ্ধেও আছে চাঁদাবাজির অভিযোগ। কমিটি গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই নুরুল্লাহর নেতৃত্বে চাঁদার দাবিতে একজন প্রকল্প পরিচালকের কক্ষ ভাঙচুর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। ডিসেম্বরই নুরুল্লাহর দুই অনুসারী লেলিন, সাব্বিরসহ কয়েকজন কর্মী চাঁদার দাবিতে নির্মাণাধীন শেখ রাসেল হলের কাজ বন্ধ করে দেন। ওই ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমজেসিএল-এমএনএইচসিএল কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজারকে মারধর করা হয়। প্রাণভয়ে তিনি পাবনা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।
জানা গেছে, বর্তমান কমিটি গঠিত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও যে কোনো অনুষ্ঠান করার জন্য ছাত্রলীগকে চাঁদা দিতে হয়। এ কাজে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কামাল হোসেন ছাত্রলীগকে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রক্টর কামাল হোসেন।
জানা গেছে, গত বছর ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগককে দাওয়াত না দেওয়ার অভিযোগ তুলে মঞ্চ তৈরির কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে প্রক্টরের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাদের শান্ত করা হয়। এ ছাড়া ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দোকানপাট থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। চাঁদা না পেয়ে দোকান ভাঙচুরের নজিরও রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বাবু কালবেলাকে বলেন, ‘এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’
নিজের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এখন সভাপতি হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সংগঠন এবং সব শিক্ষার্থীর সঙ্গেই আমার ভালো সম্পর্ক। তার মানে এই না যে, সবাই আমার কথায় চলে। কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে আমি।’
পাবিপ্রবি ছাত্রলীগের বিতর্কিত এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্য চাওয়া হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান কালবেলাকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। খোঁজখবর নিয়ে দেখব। কেউ দায়ী থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’