রমজানের আগে গতকাল শেষ শুক্রবারেও চোখ রাঙিয়েছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নিত্যপণ্যের বাজার। অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জের পণ্যের দামে। প্রায় প্রতিটি পণ্যেই ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে দাম। রমজানে পণ্যের দাম সহনশীল রাখতে শুল্ক কমানোসহ সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। উল্টো বাড়ছেই। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি ও হয়রানিতে না পড়েন, তার জন্য রাতদিন কাজ করা হচ্ছে। প্রতি ছয় ঘণ্টায় ৩৬ লাখ টন পণ্যে ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে বন্দর দিয়ে, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড।
গতকাল সরেজমিন খাতুনগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সরকার ১ মার্চ থেকে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেও বাজারে এর প্রভাব নেই। অতিরিক্ত দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে মটর ডালের দামও বেড়েছে। ১৫ দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি মটরের দাম ৫ টাকা করে বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে ভোজ্যতেল কোথাও বিক্রি হচ্ছে না। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৬৩ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকার বেশি দামে। ৫ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৮২৫ টাকায়।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ছোলায় ঠাসা। অথচ বেড়েছে পণ্যটির দাম। দুই সপ্তাহ আগেও মণপ্রতি ছোলা বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯৮ টাকায়। এখন বস্তাপ্রতি ১০০ টাকার কাছাকাছি বেড়েছে। খুচরা বাজারে আরও অতিরিক্ত দামে ছোলা বিক্রি হচ্ছে। অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে প্রতি টনে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে, আগে যা ছিল দেড় হাজার টাকা। আর পরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার টাকা, যা আগে ছিল তিন হাজার টাকা। প্রতি কেজি চিনিতে আমদানিকারকরা গড়ে শুল্ককর দিয়েছেন ৪০ দশমিক ৩৫ টাকা। এখন শুল্ক করে ছাড় দেওয়া হয়েছে কেজিতে ৭৫ পয়সা। কিন্তু চিনি বিক্রি হচ্ছে আগের মতোই। উল্টো গত দু-তিন দিন বিক্রি হয়েছে আরও বাড়তি দামে। সরাসরি বিষয়টি স্বীকার না করলেও খুরচা বিক্রেতারা বলছেন, চট্টগ্রামে এস আলমের চিনি কারখানায় আগুন লাগায় এই সুযোগ নিয়েছেন তারা। বর্তমানে প্যাকেটজাত চিনির কেজি ১৪৮ এবং খোলা চিনির কেজি ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বেশকিছু ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। প্রতি কেজি ছোলা ১০০ থেকে ১১০ টাকা, অ্যাংকর ডাল ৭৫ থেকে ৮০, ডাবলি ৭৫, মোটা দানার মসুর ১০৫ থেকে ১১০, চিকন মসুর ১৩৫ থেকে ১৪০, মোটা দানার মুগ ১৪৫ থেকে ১৫০, চিকন মুগ ১৭০ থেকে ১৮০, খেসারি ১০৫ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য পণ্যের মধ্যে খোলা আটা ৫০ থেকে ৫৫, প্যাকেট আটা ৬৫ থেকে ৬৮, খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ এবং প্যাকেট ময়দা ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চালের দাম কমানোর লক্ষ্যে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। আগে চাল আমদানিতে কেজিতে করভার ছিল ৩১ টাকা। এখন তা কেজিতে সাড়ে ২৩ টাকা কমবে। কিন্তু চালের দাম আগের মতোই। চালের পাইকারি বাজারখ্যাত চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ও পাহাড়তলী বাজারে প্রতি বস্তা চালের দাম বেড়ে ২০০ টাকার পর বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা কমেছে। মিলাররা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাইকারদের। বর্তমানে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলেও জানান তারা।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সগীর আহম্মদ বলেন, ডলার সংকট, লোহিত সাগরের উত্তেজনায় কিছু কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে এটা ঠিক, তবে ব্যবসায়ীরা যে সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে, কথাটি সত্য নয়। বাজারে পণ্যের দাম সহনশীল রাখতে আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যথেষ্ট চেষ্টা করছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখন পর্যন্ত বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতিটি পণ্যের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। তবে কেউ যদি অসাধু উপায়ে সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ায়, তার দায় সংগঠন নেবে না। আমরা প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে সাবধান করেছি।
ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন যথেষ্ট তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। কালবেলাকে তিনি বলেন, আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত বাজারের খোঁজ রাখছেন। প্রতিদিনই তারা বিভিন্ন মার্কেটে ঢুঁ মারছেন। ইতোমধ্যে খাতুনগঞ্জে কয়েকটি সতর্কতামূলক অভিযান চালানো হয়েছে। সে সময় দ্বিগুণ মুনাফায় মসলা বিক্রির সত্যতা পাওয়া গেছে। করা হয়েছে জরিমানাও। আমরা চাই ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা নিরাপদভাবেই করুক। কিন্তু ভোক্তাকে ঠকিয়ে সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করা হলে আমরা তা মেনে নেব না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে তৎপর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে। আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা চলমান। সিন্ডিকেট ভাঙতে আমরা কাজ করছি।
ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার সাবেরী বলেন, গুটি কয়েক আড়তদার, ব্যবসায়ীর কারণেই মূলত বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সিন্ডিকেট অবশ্যই ভাঙতে হবে।