বিএনপির সরকারবিরোধী আগামীর আন্দোলনে রাজপথে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চায় দলটির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এ লক্ষ্যে আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ এবং জেলা কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘ আন্দোলনের পর তৃণমূলে সংগঠনের প্রকৃত অবস্থা জানতে জেলা কর্মিসম্মেলন করছে ছাত্রদল। যেখানে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত থাকছেন। গত বুধবার রাজশাহী সাংগঠনিক বিভাগ দিয়ে পুনর্গঠনের এই কার্যক্রম শুরু করেছে সংগঠনটি। এরপর ফরিদপুর সাংগঠনিক বিভাগে কর্মিসম্মেলন হতে পারে। পর্যায়ক্রমে ৮২টি সাংগঠনিক জেলায় চলবে এই কার্যক্রম। এরপর তৃণমূলের মতামতে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়া জেলা কমিটিগুলো বিলুপ্ত করে সেখানে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।
জানা গেছে, তৃণমূলে সংগঠন পুনর্গঠনের পাশাপাশি সংগঠনের কেন্দ্রীয় আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে ছাত্রদল। তবে প্রথম ধাপে কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হলেও এর আকার বেড়ে একশর কাছাকাছি হতে পারে। এখন পদপ্রত্যাশী নেতাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, গত ২৮ অক্টোবরের পর আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিল, কেবল এমন নেতাকর্মীদের দিয়েই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হবে।
ছাত্রদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চলছে জানিয়ে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল কালবেলাকে বলেন, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে ছিল, যারা সাহসী এবং সরকারবিরোধী আগামীর আন্দোলনেও যারা রাজপথে থাকতে পারবে, এমন নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। যাতে রাজপথের আন্দোলনে যে কোনো পরিস্থিতিতে তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারে এবং এর মধ্য দিয়ে ছাত্রদলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এখন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে, সেজন্য একটু সময় লাগছে।
জেলা কর্মিসম্মেলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই কর্মিসম্মেলনের মধ্য দিয়ে তৃণমূলে ছাত্রদলের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। এর মধ্য দিয়ে একসঙ্গে দুটি কাজ হবে। সাংগঠনিক অবস্থা যেমন দেখা হবে, তেমনি সেখানে নতুন কমিটির বিষয়ে সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের একদফা দাবিতে বছরের অধিক কালব্যাপী রাজপথে আন্দোলন করে বিএনপি। বরাবরের মতো এ আন্দোলনেও বিএনপির মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রদল। কিন্তু গত ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকার পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখে দলের অবস্থান কর্মসূচিতে রাজপথে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি ছাত্রদল। এ কারণে সংগঠনটির তৎকালীন সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে সরিয়ে সিনিয়র সহসভাপতি রাশেদ ইকবাল খানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। তবে ওই কর্মসূচিতে বিএনপির অন্য অঙ্গসংগঠনগুলোও ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও শুধু ছাত্রদল সভাপতিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়। হঠাৎ করে দায়িত্ব পাওয়ায় সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঠিকভাবে সমন্বয় রক্ষা করতে পারেননি রাশেদ ইকবাল। এতে করে আন্দোলনে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের কিছু নেতা বিক্ষিপ্তভাবে মাঠে থাকলেও সার্বিকভাবে রাজপথে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি ছাত্রদল। নির্বাচনের পর আন্দোলন ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে নেমে বিএনপির মূল্যায়নে এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা যায়।
দলের মূল্যায়নে আরও উঠে আসে, নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে শ্রাবণকে সরিয়ে দেওয়া হলেও চূড়ান্ত ধাপের আন্দোলনে তিনি রাজপথে দারুণভাবে সক্রিয় ছিলেন। হরতাল-অবরোধের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে অনুসারীদের নিয়ে মাঠে ছিলেন। অনুরূপভাবে ছাত্রদলের তৎকালীন সহসভাপতি তানজীল হাসান, মুতাছিম বিল্লাহ, নাছির উদ্দীন নাছির, শ্যামল মালুম; সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ অনেকে অনুসারীদের নিয়ে আন্দোলনে ছিলেন।
বিএনপির সূত্রমতে, বিগত আন্দোলন নিয়ে এমন মূল্যায়নের ভিত্তিতে আগামীর আন্দোলন সামনে রেখে ছাত্রদলসহ অন্য অঙ্গসংগঠনের কমিটিও ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। ঘুরে দাঁড়াতে দেড় মাস মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও গত ১ মার্চ ছাত্রদলের তৎকালীন কমিটি বিলুপ্ত করে সাংগঠনিক ‘অ্যাকশন’ শুরু করে হাইকমান্ড। রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের সাত সদস্যের নতুন আংশিক কমিটি গঠন করা হয়।
ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ছাত্রদলের জেলা ও জেলা পদমর্যাদার ১১৮টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৮২টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে মাত্র ৩৩টি কমিটির মেয়াদ রয়েছে, যেগুলো শ্রাবণ-জুয়েলের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের বিগত কমিটির সময়ে হয়েছিল। বাকি জেলা কমিটিগুলো রাজীব-আকরাম এবং খোকন-শ্যামলের সময়ে দেওয়া হয়। এসব কমিটির প্রতিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। জেলা কমিটির মেয়াদ দুই বছর হলেও অনেক জেলায় এখন সাত থেকে আট বছর আগের কমিটি দিয়েও চলছে ছাত্রদলের কার্যক্রম। ২০১৪ সালের অক্টোবরে রাজীব-আকরামের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের কমিটি হয়েছিল। এ ছাড়া সংগঠনটির সারা দেশে থানা মর্যাদার (উপজেলা, থানা, পৌর ও কলেজ) ২৬শর মতো ইউনিট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে খোকন-শ্যামলের সময়ে সাড়ে ১৮শ ইউনিটে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এক বছর মেয়াদ হওয়ায় এর সবই এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। জেলা কমিটির পর থানা মর্যাদার কমিটিগুলোও পুনর্গঠন করা হবে।
জানা গেছে, আগামীর আন্দোলন সামনে রেখে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা কমিটিগুলো পর্যায়ক্রমে পুনর্গঠন করা হবে। তবে মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো কমিটি ভেঙে দেওয়া হতে পারে, যদি সেই কমিটি বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। ছাত্রদল নেতারা জানিয়েছেন, বিগত আন্দোলনে রাজপথে সন্তোষজনক ভূমিকা ছিল না, এমন কেউ জেলার নতুন কমিটিতে পদে আসতে পারবে না। এ ছাড়া এমন কোনো জেলা কমিটিও বহাল থাকবে না।
ছাত্রদল সূত্রে আরও জানা গেছে, ঢাকা মহানগরের চারটি কমিটি এবং মহানগরে অবস্থিত জেলা মর্যাদার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের (তিতুমীর কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, মিরপুর বাঙ্লা কলেজ, ঢাকা কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ) কমিটি আপাতত ভাঙছে না। এগুলোর মধ্যে মহানগর পূর্ব ও দক্ষিণের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ এবং উত্তর ও পশ্চিমের কমিটির মেয়াদও একেবারে শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে ইডেন ও বদরুন্নেসার কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও বাকি কলেজগুলোর কমিটির এখনো মেয়াদ রয়েছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সঙ্গে। কালবেলাকে দুজনেই বলেন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে ছাত্রদল। বিএনপির আগামীর আন্দোলন সামনে রেখে ছাত্রদলের সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা এখন তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ মতামতের ভিত্তিতে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার বাস্তবতায় রয়েছি। সে কারণে আমরা তৃণমূলে যাচ্ছি। আশা করছি, সাংগঠনিক সভার (কর্মিসম্মেলন) মাধ্যমে তৃণমূল থেকে সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করা সম্ভব হবে।
ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন প্রসঙ্গে তারা বলেন, ছাত্রদলের বর্তমান আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ চলছে। পদপ্রত্যাশী সম্ভাব্য নেতাকর্মীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে সক্ষম হবো। এক প্রশ্নের জবাবে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃদ্বয় বলেন, ২৮ অক্টোবরের পর যারা আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন, কেবল তাদের দিয়েই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।