চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার। বিলুপ্তপ্রায় সাপটি এখন বিচরণ করছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায়। বিশেষ করে পদ্মা-তীরবর্তী জেলা ও চরাঞ্চলে। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্তে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি, মানুষের ওপর আক্রমণ বা সাপটিকে মারার ঘটনা ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। রাসেলস ভাইপার কামড়ালেই মৃত্যু নিশ্চিত বলে প্রচার করা হচ্ছে। সাপটি অকারণে মানুষের দিকে তেড়ে আসে বলেও তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে এ নিয়ে সারা দেশে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তুতন্ত্রের বিনাশের কারণে রাসেলস ভাইপারের অস্তিত্ব চোখে পড়ছে। সাপটি মানুষকে অযথা কামড়ায় না। আত্মরক্ষার্থে কামড় দিয়ে থাকে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রচলিত অ্যান্টিভেনমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সতর্কতার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির সভাপতি ডা. মো. আবুল ফয়েজ সাপের দংশন ও এর চিকিৎসা নিয়ে বই লিখেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, গোখরা সাপের দংশনের গড় ৮ ঘণ্টা পর, কেউটে সাপের দংশনের গড় ১৮ ঘণ্টা পর ও চন্দ্রবোড়া সাপের দংশনের গড় ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর রোগীর মৃত্যু হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সময়সীমার মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা জরুরি। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কবির আলম বলেন, পদ্মার চরবেষ্টিত হওয়ায় জাজিরায় রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি রয়েছে। এখনো মানুষের মধ্যে বিশ্বাস আছে সাপে কাটলে ওঝার কাছে যেতে হবে। এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে সাপে কাটা রোগী বিলম্বে হাসপাতালে আসে। ফলে রোগীর শরীরে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়। তবে রাসেলস ভাইপারে কামড়ালে অ্যান্টিভেনম কার্যকর। এ বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে।
বেসরকারি সংস্থা ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, রাসেলস ভাইপার মোটেও দেশের সবচেয়ে বিষধর কিংবা প্রাণঘাতী সাপ নয়। বরং দেশে প্রতি বছর সাপের কামড়ে যত লোক মারা যায়, তার অর্ধেকই মারা যায় পাতি কেউটে সাপের কামড়ে। তবে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে রাসেলস ভাইপারের কামড়েও মৃত্যু হতে পারে। সংস্থাটি বলছে, দেশের যেসব সাপের সাবকিউটেনাস মেডিয়ান লিথাল ডোজ জানা (বিষের মাত্রা), তাদের মধ্যে রাসেলস ভাইপার সপ্তম (সামুদ্রিক সাপসহ)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, রাসেলস ভাইপার কামড়ালে একশ মিনিটের মধ্যে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারলে ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। কোবরা বা কেউটে কামড়ালে টেরও পাওয়া যায় না অনেক সময়; কিন্তু রাসেলস ভাইপার কামড় দিলে জায়গাটা সঙ্গে সঙ্গে ফুলে যায় এবং সাপটি সঙ্গে সঙ্গেই চলে যায় না। সেজন্য কামড় দেওয়ার পর সাপটা দেখা যায় বলে রোগী বা অন্যরা নিশ্চিত হতে পারেন। একজন চিকিৎসক দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করতে পারেন। সেটি হলে ঝুঁকিও কমে যায়। এ কারণেও এটি অন্য বিষধর সাপের চেয়ে কম আতঙ্কের। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন সারা দেশের সিভিল সার্জন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, বিভাগীয় পরিচালক, হাসপাতালের পরিচালকসহ দেশের সব স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সভা করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিভেনম হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত আছে। আপনারা আতঙ্কিত হবেন না। কোনো অবস্থাতেই অ্যান্টিভেনমের ঘাটতি তৈরি হবে না। রোগীকে হাসপাতালে আনতে যাতে দেরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
রাসেল ভাইপারের জীবনচক্র: গবেষকরা বলছেন, রাসেলস ভাইপার ভালো সাঁতার কাটে এবং এই সাপ একসঙ্গে ৩-৬৩টি পর্যন্ত বাচ্চা দিয়ে থাকে। এসব বাচ্চা দুই বছরে পরিপূর্ণ হয়। এদের গর্ভধারণকাল ছয় মাস। এ সাপটি সাধারণত নিশাচর বা রাতে চলাচল করতে পছন্দ করে এবং মানুষের বাড়িঘর এলাকায় সাধারণত এরা থাকে না। থাকার জন্য ঝোপঝাড়, ফসলের গোলা কিংবা জমির বড় গর্ত এদের পছন্দ। অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, ঘাস বনে, ঝোপঝাড়ে এরা থাকে। তাই এসব জায়গায় গেলে সাবধানতা অবলম্বন করা যেতে পারে। বড় লাঠি দিয়ে নাড়ালেই সাপ সরে যায়। কৃষকরা গামবুট পরলে এবং জমিতে নামার আগে লাঠি দিয়ে নাড়ালেই এরা সরে যাবে। তাই অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কের কোনো কারণই নেই। তবে সতর্ক অবশ্যই থাকতে হবে।
রাসেলস ভাইপারে কি সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হচ্ছে: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্যমতে, গত বছর সারা দেশে ৪ লাখ সাপে কামড়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ মারা গেছে। যাদের বেশিরভাগই কোবরা ও কেউটে প্রজাতির সাপের কামড়ের শিকার হয়েছেন। তবে রাসেলস ভাইপারের কামড়ে ঠিক কতজন মারা গেছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা গেছে, চলতি বছর রাসেলস ভাইপারের কামড়ে অন্তত প্রায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
যেসব জেলায় বিচরণ রাসেলস ভাইপারের: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রকল্প ভেনম রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের প্রায় ২৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপার আছে। ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের অন্তত ১৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চল, গড়াই এবং পদ্মা-তীরবর্তী অঞ্চলে বেশি অবস্থান ছিল রাসেলস ভাইপারের। এ ছাড়া সে সময় দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিতি দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে এর আওতা আরও বেড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, রংপুর, নওগাঁ, মাদারীপুর, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, দিনাজপুর, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিতি দেখা গেছে।
হঠাৎ কেন রাসেলস ভাইপারের উপদ্রব: সাপটির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূলত বাস্তুতন্ত্র বিনাশকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যেসব প্রাণী রাসেলস ভাইপার খেয়ে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে, প্রকৃতিতে সেসব প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। কিছু সাপ যেমন শঙ্খচূড়, খইয়া গোখরা, কালাচ বা কেউটে, শঙ্খিনী রাসেলস ভাইপারসহ অন্যান্য সাপ খেয়ে থাকে। বেজি, গুইসাপ, বাগডাশ, গন্ধগোকুল, বন বিড়াল, মেছো বিড়াল খেয়ে থাকে রাসেলস ভাইপার। এ ছাড়া তিলা নাগ ঈগল, সারস, মদন টাক এই সাপ খেতে পারে। বন্যপ্রাণী দেখলেই তা নিধন করার প্রবণতা, কারণে অকারণে বন্যপ্রাণী হত্যা, এদের আবাসস্থল ধ্বংস করাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের সর্বত্রই এসব শিকারি প্রাণী আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে রাসেলস ভাইপার অত্যধিক হারে প্রকৃতিতে বেড়ে গেছে।
রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান বন মন্ত্রণালয়ের: রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্ক নয়; বরং সাবধানতা ও সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। জননিরাপত্তা এবং জনকল্যাণ নিশ্চিতে দেওয়া হয়েছে দিকনির্দেশনা। এতে বলা হয়েছে, রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, মানুষের সঙ্গে এই সাপের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এই সাপ সাধারণত নিচু ভূমির ঘাসবন, ঝোপজঙ্গল, উন্মুক্ত বন, কৃষি এলাকায় বাস করে এবং মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। সাপটি মেটে রঙের হওয়ায় মাটির সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারে। মানুষ খেয়াল না করে সাপের খুব কাছে গেলে সাপটি বিপদ দেখে ভয়ে আক্রমণ করে। রাসেলস ভাইপার দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নদীর স্রোতে ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। তাই সবাইকে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
করণীয়: সাপের কামড় এড়াতে করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় রাসেলস ভাইপার দেখা গেছে, সেসব এলাকায় চলাচলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন। লম্বা ঘাস, ঝোপঝাড়, কৃষি এলাকায় হাঁটার সময় সতর্ক থাকুন। গর্তের মধ্যে হাত-পা ঢোকাবেন না। সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ করার সময় বুট এবং লম্বা প্যান্ট পরুন। রাতে চলাচলের সময় অবশ্যই টর্চলাইট ব্যবহার করুন। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার ও আবর্জনামুক্ত রাখুন। পতিত গাছ, জ্বালানি লাকড়ি, খড় সরানোর সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করুন। সাপ দেখলে তা ধরা বা মারার চেষ্টা করবেন না। প্রয়োজনে জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে কল করুন বা নিকটস্থ বন বিভাগের অফিসকে অবহিত করুন। সাপে কামড় দিলে দংশিত অঙ্গ নড়াচড়া করা যাবে না। পায়ে দংশনে বসে যেতে হবে, হাঁটা যাবে না। হাতে দংশনে হাত নাড়াচাড়া করা যাবে না। হাত-পায়ের গিরা নাড়াচাড়ায় মাংসপেশির সংকোচনের ফলে বিষ দ্রুত রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে বিষক্রিয়া করতে পারে। আক্রান্ত স্থান সাবান দিয়ে আলতোভাবে ধুতে হবে অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে আলতোভাবে মুছতে হবে। ঘড়ি বা অলঙ্কার বা তাবিজ, তাগা ইত্যাদি থাকলে খুলে ফেলুন। দংশিত স্থান কাটবেন না, সুঁই ফোটাবেন না কিংবা কোনোরকম প্রলেপ লাগাবেন না বা অন্য কিছু প্রয়োগ করা উচিত নয়। সাপে কাটলে ওঝার কাছে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যান। আতঙ্কিত হবেন না, রাসেলস ভাইপারের বিষ প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভেনম নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।