মায়ের সঙ্গে অভিমান করে কলেজ জীবনে একবার কক্সবাজার চলে গিয়েছিলাম। সেটাই ছিল জীবনের প্রথম ভ্রমণ, প্রথমবারের মতো একা একা দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। সময়ের আলোচিত অভিনেতা শাহেদ আলী তার ভ্রমণের গল্পটা এভাবেই শুরু করলেন। লিখেছেন ওয়াজেদ মহান।
শাহেদ আলীর গল্পে ভর করে আমিও যেন তখন নীল সমুদ্রের তীরে। কিছুটা ঘোরের মধ্যে আছি। শাহেদ আলীর কণ্ঠে বেশ উত্তেজনা। এ যেন গল্পে বুঁদ হয়ে পড়া নিমিষেই...
ওই ঘটনার পরের বছর কী হলো শুনবেন? আমরা বেশ কজন বন্ধু মিলে হুট করেই সিদ্ধান্ত নিলাম, দার্জিলিং যাব। যেই কথা সেই কাজ। পকেটে হাজার পাঁচেক টাকা পুরে ছুটলাম দার্জিলিংয়ে। শিলিগুড়ি পৌঁছে মানি এক্সচেঞ্জ করার প্ল্যান ছিল। কিন্তু দার্জিলিংয়ে টাকা ভাঙালে বেশি পাব, এ ভেবে সেখানে আর চেঞ্জ করিনি। ওদিকে দার্জিলিংয়ে গিয়ে দেখি সেখানে একমাত্র স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতেই শুধু মানি একচেঞ্জ করে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা শুধু ডলারই কনভার্ট করে দেয়, অন্য কোনো মুদ্রা বিনিময় করে না। আমার মাথায় হাত। পাক্কা পাঁচ হাজার টাকা পকেটে কিন্তু এর এক টাকাও খরচ করার সাধ্য আমার নেই! কী ভয়াবহ এক অসহায়ত্ব আমার তখন। বন্ধুরা ছিল বলে রক্ষা...
শাহেদ আলী হাসতে শুরু করলেন। মনশ্চক্ষুতে দেখে নিতে অসুবিধে হলো না, শাহেদ আলী এই মুহূর্তে তার সেই বন্ধুদের কথা ভাবছেন, তাদের নিয়ে ঘুরছেন সুদূর দার্জিলিংয়ে!
দার্জিলিং থেকে শাহেদ আলীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে প্রশ্ন করি… কাজের প্রয়োজনে তো কত জায়গায় যাওয়া হয়। এমন কি হয়েছে যে কোথাও গিয়ে মন আটকে গেছে? রীতিমতো ঘরবাড়ি বেঁধে থেকে যেতে ইচ্ছে হয়েছে?
শাহেদ আলী একমুহূর্ত ভাবলেন। তারপর উত্তর দিলেন, সে তো অনেক জায়গাতেই হয়েছে। মনপুরা ছবির শুটিংয়ে ধুনটে গিয়েছিলাম। প্রত্যন্ত এক চরাঞ্চল, চারদিকে চোখ-ধাঁধানো সবুজ প্রকৃতি, ওপরে অসম্ভব সুন্দর নীল আকাশ। সে প্রকৃতিটা যেন ঘড়ির কাঁটা ধরে তার রূপ পরিবর্তন করত। রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতাম প্রকৃতির সে রঙের খেলা। মাঝেমধ্যে নদীর ধারে একা বসে থাকতাম মাথার ওপর নীল আকাশকে ছাদ বানিয়ে। টানা ১৪ দিন সে জায়গায় শুটিং হলো। যেদিন ফিরে আসব, সেদিন আর কোনোভাবেই আসতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল থেকে যাই। ফেরার সময়ে নিজের সঙ্গে নিজে প্রতিজ্ঞা করে আসছিলাম। আমি আবার এখানে আসব…
উত্তেজনার রেশ টানতে না পেরে গল্পে ছন্দপতন ঘটাই আমি… গিয়েছিলেন?
শাহেদ আলী উত্তর করেন… হ্যাঁ গিয়েছিলাম। কিন্তু অবাক বিষয় কি জানেন, এরপর গিয়ে একটুও ভালো লাগেনি!
ভ্রমণের ট্রেনে চেপে আমরা তখন বহুদূর। শাহেদ আলী নিজের মতো করে বলতে শুরু করেন। শুটিংয়ের বাইরে আমার ভ্রমণ কিংবা ঘোরাঘুরির যে অভ্যাসটা, সেটা তৈরি করে দিয়েছে দীপা, মানে আমার স্ত্রী। এখন প্রায়ই আমরা সপরিবারে ঘুরতে বের হই। অদ্ভুত বিষয় কি জানেন, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতি আমাকে খুব টানে। আর সেই টানেই কলেজ জীবনে একবার চলে গিয়েছি বান্দরবান। শহর থেকে প্রায় আড়াই মাইল দূরে হিলসাইড রিসোর্ট নামে একটা রিসোর্টে বেশ কিছুদিন থেকেছিলাম। কী দারুণ নির্জনতা সেখানে, কী অসীম সৌন্দর্য সে নিঝুম প্রকৃতিতে! সে সময় মনে মনে ভেবেছিলাম, এই প্রকৃতি আর সৌন্দর্যটা শেয়ার করার জন্য একটা মানুষ থাকলে ভালো হতো। অদ্ভুত ব্যপারটা হলো এই যে, কিছুদিন আগে দীপা, আদৃক (সরি ভাই, ভাস্তির নামটা ভুলে গেছি)সহ আমরা সবাই বান্দরবান গিয়ে সেই রিসোর্টে থেকে এসেছি। আমার শুধুই মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি আমার ইচ্ছে পূরণ করতেই বুঝি আমাদের একসঙ্গে সবাইকে সেখানে টেনে নিয়ে গেছে!
এ গল্পের মাঝে বিরতি এঁকে দেয় শাহেদ আলীর ছোট্ট মেয়ের ডাক। বাবাকে তার একটু প্রয়োজন। মেয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে ফিরে এলে তাকে প্রশ্ন করি… অনেক দেশ তো ঘোরা হলো আপনার। এত লম্বা ভ্রমণে কোন বিষয়টাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে আপনার কাছে?
শাহেদ আলীর ঝটপট উত্তর, মানুষ। দেখুন প্রত্যেকটা অঞ্চলের মানুষ আলাদা। তাদের আচার-আচরণ, স্বভাব, সব আলাদা। এই যেমন ধরুন ভুটানের এক ট্যাক্সিচালকের কথা। ভুটানে ঘুরতে গিয়ে একবার আমরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে সারা দিন শহরে ঘুরেছি, শপিং করেছি বেশ। সে শপিংয়ের ব্যাগগুলো গাড়িতে রেখে আমরা আরেকটি মলে ঢুকছিলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার সঙ্গেই আসছিল। পেছনে তাকিয়ে দেখি গাড়ির দরজা খোলা, গ্লাস খোলা। তাকে বললাম, আপনি গাড়ির গ্লাস লাগাননি, দরজা খুলে চলে এসেছেন। সে বলে… সমস্যা নেই। কেউ কিচ্ছু ধরবে না। তোমার খুব মূল্যবান কিছু যদি তুমি এখানে ভুল করে রেখে যাও, পরে ফিরে এসে দেখবে এখানেই পড়ে আছে। কেউ ছুঁবে না।
ভুটানের এই লোকটার পাশাপাশি আরেকটা গল্প বলি। আমার ছোট বোন অস্ট্রেলিয়া থাকে। একবার সেখানে বেড়াতে গেলাম। শহর থেকে দূরে একটা জায়গায় ঘোরাঘুরি শেষে বাসায় ফিরে আসার সময় দেখি কিছু লোক রোডসাইড লেকে ফিশিং করছে। তাদের একজনের সঙ্গে একটু আলাপ হলো। বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে সে বেশ খোঁজখবর রাখে। আমি বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি শুনে সে তার মাছগুলো থেকে প্রায় ৮০ ভাগ মাছ আমাকে দিয়ে দিল। আমি বেশ অবাক হলাম। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, সে মাছগুলো এতই সুস্বাদু ছিল যে, এর স্বাদ আজও ভুলিনি আমি।
আমাদের গল্প এগিয়ে চলে ঘড়ির কাঁটা ধরে। ওদিকে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত গভীর হতে থাকে। শাহেদ আলীর ছেলে আদৃক এসে বাবার পাশে বসে। এ যেন বাবার মুখে রূপকথার গল্প শুনে তার ঘুমুতে যাওয়ার প্রস্তুতি।
শাহেদ আলী বলেন, মনের মানুষের শুটিং করতে একবার জলপাইগুড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানকার চিলেপোতার জঙ্গলে শুটিং হচ্ছিল। আমরা সারা দিন ধরে সে গভীর জঙ্গলে শুটিং করতাম আর সন্ধ্যা নামার আগে ফিরে চলে আসতাম। কারণ সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই বুনো হাতির পাল সারা বন দাপিয়ে বেড়ায়। একদিন জঙ্গলের এক ফাঁকা জায়গায় অর্ধেক কাজ শেষ করে ফিরে এসেছি। পরদিন আবার শুটিংয়ে গিয়ে দেখি, ওই বিশাল ফাঁকা জায়গাটা রীতিমতো নালায় রূপ নিয়েছে। আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ। স্থানীয়রা জানালেন, রাতের বেলা শত শত হাতি এ জায়গা দিয়ে আসা-যাওয়া করেছে, তাই এ অবস্থা। শেষ পর্যন্ত ওই জায়গায় মাটি ভরাট করে আমাদের শুটিং শেষ করতে হয়।
এ জায়গায় এসে গল্পের ট্রেন গন্তব্য খুঁজে ফিরে। শেষ করার আগে প্রশ্ন করি, এমন কখনো হয়েছে যে ঘুরতে গিয়ে আর ভালো লাগছিল না, বাসায় ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন?
শাহেদ আলী ফিরে গেলেন জলপাইগুড়ির সেই চিলেপোতা জঙ্গলে—বেশ কয়েক দিন ধরে শুটিং হচ্ছিল চিলেপোতায়, একদিন মন ছুটে গেল। ইচ্ছে হলো দেশে চলে আসি। মনে হলো, পরিবার থেকে কে যেন শেকল দিয়ে টানছে আমাকে, আমি ছেলে আদৃককে কল করে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। এমন প্রায়ই হয়।
ঠিক এ সময়ে আদৃক রুমে ঢোকে। বাবাকে শুভরাত্রি জানিয়ে যায়, রাত যে তখন অনেক!
আমিও বিদায় নিলাম, ধানমন্ডির ৯ নম্বর রোডে তখন রাতের নির্জনতা।
মন্তব্য করুন