দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন সংগঠন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মৃত্যুভয় পদদলিত করে সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও দক্ষতার গুণে বিশ্বে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিতে তার পদচারণা আওয়ামী লীগকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন বিশ্ব নেতৃত্বের কাতারে। চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সাফল্যের মূলে ছিল নির্বাচনমুখী মনোভাব ও সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনাচারণ ও দূরদর্শিতা।
স্বাধীনতার রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রেরণাদায়ী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দীক্ষা পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে। আর এই পথচলার শুরু ছাত্রজীবনে
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তৎকালীন সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ) পড়ার সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এই কলেজ থেকে তিনি ১৯৬৬-৬৭ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের বিয়োগান্তক হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় তৎকালীন সেনাশাসিত সরকার। পিতা, মাতা, ভাইদের হত্যার বিচারের দাবিতে বিশ্ববাসীর কাছে বারবার দাবি জানিয়েও নিরাশ হয়েছেন। হত্যার বিচার ও দেশের মানুষের জন্য বিদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার মাধ্যমে রাজনীতির শানিত অস্ত্র তুলে নেন হাতে। দলকে সংগঠিত করতে ১৯৮১ সালে তার অনুপস্থিতিতে সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তাকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করে। মানুষের ভাগ্য গড়তে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া কালবেলাকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে না ফিরলে কী হতো, তা কল্পনাতীত। তবে তিনি ফিরে এসেছেন বলেই দেশ মর্যাদার আসনে। উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে আমাদের দেশ এখন বিশ্ব-উদাহরণ। পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন ও দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে রাজনৈতিক জীবনে নিয়েছেন ঝুঁকি। স্বপ্ন বাস্তবায়নে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে মানুষের ভালোবাসা ও তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সততা, সাহস ও প্রজ্ঞা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
দেশে ফিরে দূরদর্শী শেখ হাসিনা তার দিব্য দৃষ্টিতে অনুধাবন করেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন সম্ভব। শুরু করেন নতুন লড়াই। আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন বুকে লালন করেন, তার প্রথম ধাপ হিসেবে সামরিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। তৎকালীন সরকার বিপদ টের পেয়ে ১৯৮৫ সালে তিন মাস গৃহবন্দি করে রাখে শেখ হাসিনাকে। এরই মধ্যে চলে আসে শেখ হাসিনার প্রথম সংসদীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫ দলীয় জোট নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন শেখ হাসিনা। তিনটি আসনে বিজয়ী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ৯৭ আসনে জয়ী হয়। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন তিনি। সেনাশাসিত সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের নাভিশ্বাসে বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা পার্লামেন্ট থেকে ওয়াক আউট করে এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে এমপি পদ থেকে ইস্তফা দেন। শুরু করেন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের আন্দোলন।
সেনাশাসিত সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল শেখ হাসিনা ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চের নির্বাচন বর্জন করেন। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন।
দেশের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। সেখানে ৮৮ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী দল হিসেবে আবারও সংসদে যায় আওয়ামী লীগ। ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন শেখ হাসিনা। এ সময় তার নেতৃত্বে বিরোধী দল সংসদ ত্যাগ করে এবং পরে সংসদ থেকে ইস্তফা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ। ফলে তিন মাসের মধ্যে ষষ্ঠ সংসদ বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১২ জুন। সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে বিজয়ী হয়। দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। একই বছর নভেম্বরে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানির হিস্যা নিয়ে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি করেন শেখ হাসিনা। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য করেন ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তি।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ক্ষমতার বাইরে চলে যায় আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা ৬২টি আসন পেয়ে হন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট রাজকারদের মন্ত্রী বানিয়ে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত পতাকা তুলে দেয় তাদের গাড়িতে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত হয়। হামলায় ২৪ জন নিহত ও ৫০০ নেতাকর্মী আহত হন। নেতারা মানববর্ম রচনা করে নিজেদের জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করেন শেখ হাসিনাকে। কিন্তু তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৮১ সালে দেশের ফেরার পর থেকে ২১ বার শেখ হাসিনার ওপর প্রাণঘাতী হামলা হয়। এরই মধ্যে চলে আসে নবম সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটারের তালিকা করে পাতানো নির্বাচনের চেষ্টা হয়। এর প্রতিবাদ করে আওয়ামী লীগ। ২০০৭ সালে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আবারও প্রতিহিংসার শিকার হন শেখ হাসিনা। প্রথম গ্রেপ্তার হন শেখ হাসিনা। মুক্তি পান ২০০৮ সালের ১২ জুন। সে বছরের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। দ্বিতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৪টি আসন লাভ করে। এর মাধ্যমেই শেষ হয় বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন।
এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতাকারী বিএনপি-জামায়াত জোট সারা দেশে শুরু করে অগ্নিসন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও, নাশকতা ও মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার রাজনীতি, যা চলতে থাকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে। বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা ও নির্বাচন বর্জনের মধ্যেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট ২৩৪টি আসন পায়। শেখ হাসিনা তৃতীয়বার ও টানা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিবন্ধিত প্রায় সব দলই অংশ নেয়। ২৫৭টিতে এককভাবে জয় পায় আওয়ামী লীগ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে চতুর্থবারের মতো শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এই টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে শেখ হাসিনা আকাশচুম্বী চ্যালেঞ্জ আর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে উন্নয়ন ও অগ্রগতির নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছেন। দেশকে করেছেন ডিজিটাল। নিয়ে গেছেন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে। এখন স্বপ্ন দেখছেন স্মার্ট বাংলাদেশের।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, বিশ্ব মোড়লদের চোখ রাঙানি ও নিষেধাজ্ঞা, বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও এবং নির্বাচন বর্জনের পরেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আবারও একক সংখ্যাঘরিষ্ঠতা নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে চলছেন শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালবেলাকে বলেন, তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেন না, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেও জানেন। অসীম সাহস ও ধৈর্যের মাধ্যমে, প্রতিভা ও নৈতিকতার মিশেলে তার সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। জাতির পিতার সোনার বাংলা বিনির্মাণে তার তুলনা শুধু তিনি। আর এই স্বপ্ন পূরণের পথে নির্বাচনে মানুষের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে মানুষের রায়েই তিনি চারবারের সার্থক প্রধানমন্ত্রী।