বাহাউদ্দিন গোলাপ
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত

জন্ম দ্বিশতবর্ষের আলোয় আধুনিকতার প্রথম মহানায়ক ও তার মনস্তাত্ত্বিক বিনির্মাণ

মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ছবি : সংগৃহীত
মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ছবি : সংগৃহীত

কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তার এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তার কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থি প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।

​মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তার অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।

​কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তার মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তার সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তার নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।

​বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তার প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তার ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।

​বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তার 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না। ​পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশ সরে দাঁড়ানোয় সুযোগ পাওয়া স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

১০

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১১

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১২

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১৩

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

১৪

ডেমোক্র্যাটের মুসলিম নারী সদস্যের সম্পদ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৫

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

১৬

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

১৭

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

১৮

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

১৯

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

২০
X