

২০০৩ সালে ২২তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন মো. আব্দুর রহমান (ছদ্মনাম)। বর্তমানে তিনি একটি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে শিক্ষকতা করলেও তিনি এখনো পঞ্চম গ্রেডেই বেতন পান। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত।
অন্যদিকে একই সময়ে একই বিসিএস ব্যাচে বিভিন্ন ক্যাডারে কর্মরতরা দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের বেতন পাচ্ছেন। একই মেধা, একই পরীক্ষা, একই বিসিএসে যোগদান করলেও পদ-পদবিতে বৈষম্যের শিকার সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সহযোগী অধ্যাপকরা।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ২১, ২২ ও ২৩তম ব্যাচের শিক্ষকরা দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে উচ্চশিক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের অধিকাংশই দীর্ঘ ৯ থেকে ১০ বছর ধরে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পেশাদারি থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি না পাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ। এতে পেশাগত অগ্রগতিতেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
জানা যায়, ২১ ও ২২ তম ব্যাচের পরীক্ষা শুরু থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া দুই সরকারের সময়ে সমাপ্ত হয়েছে। এদের প্রিলিমিনারি, লিখিত ও সাইকোলজিক্যাল টেস্ট হয় ২০০০ সালে আর ভাইবা ও চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হয় ২০০৩ সালে। তাই পেশাগত দিক থেকে এই দুইটি ব্যাচকে একেবার নিরাপেক্ষ ও সৃজনশীল ব্যাচ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, একই সময়ে একই বিসিএসে যোগদান করেও অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতি পাচ্ছেন; কিন্তু শিক্ষা ক্যাডার দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি সংকটে ভুগছে। পাঠদান, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা; সব ক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার পরও তারা পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন না, যা হতাশা তৈরি করছে।
এদিকে গত কয়েক বছর ধরে এসব শিক্ষক বেতন কাঠামোর পঞ্চম গ্রেডের শেষ ধাপে অবস্থান করছেন। ফলে চলতি অর্থবছর থেকেই তাদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষকদের দাবি, অধ্যাপক হলেও তারা চতুর্থ গ্রেডের শেষ ধাপেই অবস্থান করবেন। তাই পদোন্নতিতে সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়বে না, এটি কেবল সম্মান ও পদগত স্বীকৃতি।
এ পরিস্থিতিতে কলেজ পর্যায়ে একাডেমিক নেতৃত্ব সংকটও তৈরি হয়েছে। সহযোগী অধ্যাপক পদে আটকে থাকার কারণে অনেক সরকারি কলেজে অধ্যাপক না থাকায় জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব, গবেষণা তত্ত্বাবধান ও নতুন শিক্ষকদের গাইড করার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ২২তম ব্যাচ সরকারের কাছে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে আবেদন জানিয়েছে। সেখানে বলা হয়, তারা ২০০৩ সালের ১০ ডিসেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ইতোমধ্যে ২৩ বছরের সেবা সম্পন্ন করেছেন। যোগদানের ১০ বছর পূর্তিতে তারা সিলেকশন গ্রেড পান এবং ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে টানা ১২ বছর ধরে একই পঞ্চম গ্রেডে অবস্থান করছেন। অথচ একই বিসিএস ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম থেকে ১৮তম ব্যাচের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা অবসরে যাবেন। ফলে বড় শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এর আগে ২২তম ব্যাচকে অধ্যাপক পদে উন্নীত করা গেলে অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই কলেজ পর্যায়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষকদের দাবি, পদোন্নতি দিলে সরকারের ব্যয় বাড়বে না। বরং অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে থাকা বৈষম্য কিছুটা কমবে। এতে তাদের সামাজিক মর্যাদা ও কর্মপ্রেরণা বাড়বে, যা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে দ্রুত অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিশ্চিত করবে সরকার।
হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. তোফাজ্জল আলী কালবেলাকে বলেন, গত প্রমোশনে চারটি ব্যাচের মোট এক হাজারেরও বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। তাই এখন যদি ২১ ও ২২তম ব্যাচকে প্রমোশন দেওয়া হয়, এতে নতুন কোনো আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে না। তাছাড়া ২০২৯ সাল থেকে এসব কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে পিআরএলে যেতে শুরু করবেন, এ কারণে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনার দাবি রাখে।
তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, শিক্ষায় ইতিবাচক ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার মতো যোগ্যতা, সক্ষমতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা এই ব্যাচের রয়েছে। ২০২৬ সাল নাগাদ ১৬ থেকে ১৮তম ব্যাচের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা পিআরএলে চলে যাবেন। এর ফলে ২০২৬ এর পর শিক্ষা প্রশাসনে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হবে। তাই এই মুহূর্তে ২১ ও ২২তম ব্যাচের পদোন্নতি না দিলে ভবিষ্যতে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রশাসনিক ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ার মালেক মজুমদার বলেন, একই বিসিএস থেকে যোগদান করলেও অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা ঠিক সময়ে পদোন্নতি পাচ্ছেন। কিন্তু আমরা এক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হবে না। আমরা চাই আমাদের ন্যায্য পদোন্নতি। প্রয়োজনে ব্যাচ ভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হোক। প্রয়োজন সংখ্যক পদ খালি না থাকলে স্বাস্থ্য ক্যাডারের মতো সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্ট করে পদোন্নতি দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীন মোবাইল ফোনে কালবেলাকে বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।
মন্তব্য করুন