

সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ লক্ষ্যে মাজার দুটির আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিতভাবে প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম এ নির্দেশনা দেন। সভায় মাজার দুটির পরিচালনা কমিটি, মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির প্রতিনিধি, মোতাওয়াল্লি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার সিলেটের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রতি সপ্তাহে বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ভক্ত মাজারে আসেন। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিতভাবে প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
তিনি পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা, পার্কিং, পরিচ্ছন্নতা ও অন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে মাজারকেন্দ্রিক পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানান। এর আওতায় আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক সুবিধা এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামো আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সিলেটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর নাম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থী মাজারে আসেন। তারা নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু, খাদ্যসামগ্রী ও বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী দান করেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার দান জমা পড়ে এসব মাজারে। তবে সেই অর্থ কীভাবে পরিচালিত হয়, কোথায় ব্যয় করা হয় কিংবা মোট আয় কত—এসব বিষয়ে কখনোই জনসম্মুখে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল ছিল।
জানা গেছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর সিলেটের ঐতিহাসিক দরগাহগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আসে। সম্প্রতি সিলেট সিটি করপোরেশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা কমিশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাজারগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্পষ্টতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে।
পুরোনো বিতর্ক আবার আলোচনায় মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ২০০৩ সালে শাহজালাল (রহ.) মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয়ভাবে দরগাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সে সময় সংবাদমাধ্যমে মাজারের বিপুল আয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, দানের অর্থের একটি অংশ বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীদের ব্যয়ে ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট অর্থ মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়।
তবে সেই ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত ও জনসম্মুখে উপস্থাপিত হিসাব কখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের সেই অস্বচ্ছতা দূর করতে জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিসি সারওয়ার আলম বলেন, ‘মাজার কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে এসব স্থাপনাকে আরও আধুনিক ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।