চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক বেণু কুমার দের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষক সমিতির সদস্যসহ অর্ধশতাধিক শিক্ষক।
সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন তারা।
চবির আইন ১৯৭৩ লঙ্ঘন করে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বাংল ও আইন বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ এবং দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহতভাবে চলমান ব্যাপক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষক সমিতির নেতাসহ শিক্ষকরা।
এ সময় আইন বিভাগের সাবেক ডিন অধ্যাপক এ বি এম. আবু নোমান বলেন, আমি আজ ২৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। সপ্তাহে মাত্র চারটা ক্লাস নিতে হয় আমাকে। আমাদের কোনো ক্লাসলোড নেই। তবুও উপাচার্য অন্যায় করে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে। তার সাথে উপ-উপাচার্যও জড়িত রয়েছে। তারা এ অন্যায় লাগাতার করেই যাচ্ছে। তাদের পদত্যাগ ছাড়া এ থেকে মুক্তির উপায় নেই।
বাংলা বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল আযম বলেন, বাংলা বিভাগে যেমন একটা অন্ধকার যুগ থাকে, তেমনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন অন্ধকার যুগ চলতেছে। আমাদের বিভাগে নতুন কোনো শিক্ষক প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া, আমাদের বাংলা বিভাগের মতো যে বিভাগে আনিসুজ্জামানের মতো লোকেরা শিক্ষক ছিলেন, সে বিভাগে কীভাবে অন্যায় অনিয়ম করে কম সিজিপিএ দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ হবে। আমাদের বিভাগ খুব ভালোভাবে চলছে। তবুও উপাচার্য অন্যায়ভাবে নিয়োগের কার্যক্রম চালাছে।
শিক্ষক সমিতির কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেকান্দর চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচলিত হোক। ১৯৭৩ এর আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় চলুক। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সে জায়গা থেকে সরে এসেছে। সেজন্য শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে, অন্যায়ের বিপক্ষে কর্মসূচি পালন করছে। আমরা তাদের সকল যৌক্তিক কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি।
এ সময় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল হক বলেন, উপাচার্য স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে অবৈধভাবে নিয়োগ দিচ্ছেন। বিভিন্ন অন্যায় অনিয়মের সাথে জড়িত হয়েছেন। সুতরাং, উপাচার্য উপ-উপাচার্য তাদের নীতিনৈতিকতা হারিয়েছেন। সুতরাং তাদের অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে।
এর আগে গতকাল রোববার চবির আইন ও বাংলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগবোর্ড বাতিলের দাবিতে শিক্ষক সমিতি অবস্থান নিলে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ছিদ্দিকীর সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরে দিনভর এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা যায়।
এদিন দুপুর সাড়ে ১২টায় শিক্ষক সমিতির নেতারা নিয়োগ বাতিলের দাবিতে চিঠি দিতে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। এ সময় দুপক্ষ চরম বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। দাবিতে অনড় থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত উপাচার্য দপ্তরে অবস্থান নেন অর্ধশতাধিক শিক্ষক।
পরে উপাচার্যের কার্যালয় থেকে উপাচার্যের বাংলোতে নিয়োগ বোর্ডের স্থানান্তর করলে সন্ধ্যায় শিক্ষক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষক সমিতির নেতারা। এ সময় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষক সমিতি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) সকালে প্রশাসনিক ভবনের সামনে দুই ঘণ্টা অবস্থান নিবেন শিক্ষকরা।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ছিদ্দিকী বলেন, কাউকে কিছু না জানিয়ে বাংলোতে গিয়ে ভাইভা নেওয়াটা নজিরবিহীন ঘটনা। এর আগেও আমরা বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি দাওয়া জানিয়ে আসছি। তবে প্রশাসন সেদিকে কর্ণপাত করেনি। অন্যায়কে বাস্তবায়ন করার জন্য আজ যে গর্হিত কাজ উপাচার্য করেছে তা আইনের পরিপন্থি। এ ঘটনায় উপ-উপাচার্যেরও দায় আছে বলে আমরা মনে করি।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল হক বলেন, আমরা উপাচার্যকে বোঝানোর জন্য গেলে তিনি কথা পর্যন্ত বলেননি। একপর্যায়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতির সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত। এ প্রক্রিয়ায় আগেও নিয়োগ হয়েছে। তারা উপাচার্যকে ক্ষমতা থেকে সরানো ও বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে।
এদিন শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্যকে আইন ও বাংলা বিভাগের নিয়োগ বোর্ড বাতিলের দাবিতে চিঠি দিতে গিয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ছিদ্দিকী চিঠি পাঠ করার একপর্যায়ে উপাচার্য উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে উপাচার্যপন্থি ও শিক্ষক সমিতির শিক্ষকরা বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপাচার্য দফতরে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। এ সময় প্রশাসনপন্থি শিক্ষকরা কয়েক দফায় উপাচার্য দফতর থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এদিকে সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠেয় নিয়োগবোর্ড থেকে চার সদস্যের মধ্যে দুজন অংশ নিবেন না বলে উপাচার্য বরাবর এক চিঠিতে জানান। তারা হলেন, বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. তাসলিমা বেগম ও বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মহিবুল আজিজ। পরিকল্পনা কমিটির সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তারা।
মন্তব্য করুন