

ভালো ঘুম মানে শুধু ক্লান্ত শরীরকে একটু বিশ্রাম দেওয়া নয়, বরং ভালো ঘুমই সুস্থ শরীর, সতেজ মন আর কর্মক্ষম জীবনের মূল চাবিকাঠি। অথচ আধুনিক ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেকেই ঘুমকে গুরুত্বই দিই না। কাজের চাপ, মোবাইল স্ক্রলিং, অনিয়মিত জীবনযাপন—সব মিলিয়ে না বুঝেই এমন কিছু অভ্যাস গড়ে তুলি, যা ধীরে ধীরে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
সমস্যা হলো, এই ভুলগুলো একদিনে বড় কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো থেকেই জন্ম নেয় অনিদ্রা, সারাদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, মাথাব্যথা, এমনকি নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতা। তাই প্রশ্ন উঠছে, প্রতিদিনের কোন কোন অভ্যাস আপনার ঘুমের ‘বারোটা’ বাজাচ্ছে? আর কেন এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
প্রতিদিন একই সময়ে না ঘুমানো
কখনো রাত ১০টায়, কখনো আবার রাত ১টা বা ২টায় ঘুম—এই অনিয়ম শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক বা সার্কাডিয়ান রিদমকে বিগড়ে দেয়। ফলে শরীর বুঝে উঠতে পারে না কখন বিশ্রাম নেওয়ার সময়। এর ফল হিসেবে দেরিতে ঘুম আসা, ঘুম গভীর না হওয়া এবং সকালে ঘুম ভাঙার পরও ক্লান্ত লাগার মতো সমস্যা দেখা দেয়। সারাদিন ঝিমুনি আসে, কাজেও মন বসে না।
ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম
ঘুমানোর আগে মোবাইল, টিভি বা ল্যাপটপে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটানো ঘুমের বড় শত্রু। এসব ডিভাইসের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। এই হরমোনই আমাদের ঘুম পেতে সাহায্য করে। ফলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে, ঘুম আসতে দেরি হয় এবং ঘুমের মানও খারাপ হয়ে যায়।
বিছানায় নানা কাজ করা
বিছানায় শুয়ে কাজ করা, ফোন ঘাঁটা বা ওয়েব সিরিজ দেখার অভ্যাস থাকলে মস্তিষ্ক আর বিছানাকে ঘুমের সংকেত হিসেবে নেয় না। ধীরে ধীরে বিছানায় গেলেই ঘুম আসার যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বিছানায় শুয়েও অনেকক্ষণ জেগে থাকতে হয়।
রাতে ভারী খাবার খাওয়া
রাতে দেরি করে খাওয়া কিংবা তেল-মশলাদার, ভারী খাবার খেলে হজমে সমস্যা তৈরি হয়। এর ফলে বুক জ্বালা, অস্বস্তি এবং বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। ভালো ঘুমের জন্য রাতের খাবার হওয়া উচিত হালকা এবং তা খেয়ে নেওয়া উচিত ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে।
অতিরিক্ত চা-কফি বা ক্যাফিন গ্রহণ
বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা, কফি বা অন্য ক্যাফিনযুক্ত পানীয় গ্রহণ করলে তার প্রভাব রাত পর্যন্ত থাকে। অনেকেই ভাবেন, এক কাপ কফিতে তেমন কিছু হবে না। কিন্তু নিয়মিত এই অভ্যাস ঘুমের গভীরতা কমিয়ে দেয় এবং সহজে ঘুম আসতে বাধা সৃষ্টি করে।
সপ্তাহান্তে বেশি দেরি করে ওঠা
ছুটির দিনে অনেকেই মনে করেন বেশি ঘুমিয়ে নেওয়াই বুঝি ঘুম পুষিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে এতে সপ্তাহের বাকি দিনের ঘুমের ছন্দ আরও এলোমেলো হয়ে যায়। একে বলা হয় সোশ্যাল জেট ল্যাগ। তাই ছুটি পেলেই বেলা অবধি ঘুমানোর অভ্যাস ত্যাগ করাই ভালো।
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
চিন্তা, দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ নিয়ে সরাসরি বিছানায় গেলে মন শান্ত হয় না। মন শান্ত না হলে সেই ভাবনা অবচেতন মনে চলতেই থাকে, যা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। অনেক সময় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। এই সমস্যা কমাতে ঘুমের আগে ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা হালকা বই পড়ার মতো অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
শেষ কথা
ভালো ঘুমের জন্য দরকার নিয়মিত রুটিন, সচেতন অভ্যাস এবং নিজের শরীরের সংকেত বোঝার ক্ষমতা। প্রতিদিনের এই ছোট ছোট ভুলগুলো ঠিক করতে পারলেই ধীরে ধীরে ঘুমের মান উন্নত হবে। আর ভালো ঘুম মানেই ভালো স্বাস্থ্য, সতেজ মন আর কর্মক্ষম জীবন।
সূত্র : এই সময় অনলাইন
মন্তব্য করুন